(ক) অর্গানন অব মেডিসিন ও তা আয়ত্ত করার উপায়:
'অর্গানন' (Organon) একটি গ্রীক শব্দ যার আভিধানিক অর্থ কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, চিন্তার হাতিয়ার বা নিয়মাবলী। মহাত্মা স্যামুয়েল হ্যানিম্যান চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে গ্রন্থে হোমিওপ্যাথির মূলনীতি, দর্শন এবং রোগ আরোগ্যের চিরন্তন প্রাকৃতিক নিয়মসমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন, তাকে 'অর্গানন অব মেডিসিন' বলা হয়। এটি হোমিওপ্যাথির মূল সংবিধান।
সহজে আয়ত্ত করার উপায়: ১) গ্রন্থটির প্রতিটি সূত্র বা অনুচ্ছেদ (Aphorism) মুখস্থ করার চেয়ে এর অন্তর্নিহিত দর্শন বুঝতে হবে। ২) মূল সূত্রের সাথে হ্যানিম্যান প্রদত্ত পাদটীকা বা ফুটনোটগুলো মিলিয়ে পড়তে হবে। ৩) হোমিওপ্যাথির মূল ৭টি নীতি মাথায় রেখে প্রতিটি সূত্রের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে হবে। ৪) চেম্বারে রোগী লিপি (Case Taking) তৈরির সময় বাস্তব ক্ষেত্রে অর্গাননের নিয়মের প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
(খ) homeopathy একটি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি:
হোমিয়োপ্যাথি কেবল একটি আংশিক বা সাময়িক উপশমকারী চিকিৎসা নয়, এটি একটি চিরন্তন ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা বিজ্ঞান। কারণ:
১) এটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতি (সদৃশ বিধান)-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ২) এতে রোগাক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গের চিকিৎসা না করে পুরো মানুষের (দেহ ও মন) চিকিৎসা করা হয়। ৩) রোগীর মানসিক লক্ষণ, শারীরিক গঠন, বংশগত ইতিহাস এবং পরিবেশগত প্রভাবের সামগ্রিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আরোগ্য সাধন করা হয়। ৪) এটি রোগের মূল কারণ তথা অভ্যন্তরীণ মায়াজমকে দূর করে রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলে।
(গ) মিশ্র চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে হ্যানিম্যানের মতামত:
মহাত্মা হ্যানিম্যান মিশ্র চিকিৎসা পদ্ধতি (একত্রে একাধিক ওষুধ মিশ্রণ করে বা পেটেন্ট ওষুধ প্রয়োগ করা)-কে তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন। অর্গাননের ২৭২ ও ২৭৩ নম্বর সূত্রে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এক সময়ে রোগীর জন্য কেবল একটিমাত্র একক এবং সরল ওষুধ নির্বাচন ও প্রয়োগ করতে হবে। মানুষের জীবনী শক্তি একক ও সরল, তাই তার রোগ দূর করতে একক ওষুধই যথেষ্ট। একাধিক ওষুধ একসাথে দিলে তাদের পারস্পরিক বিক্রিয়ায় শরীরে নতুন কৃত্রিম জটিল রোগ তৈরি হতে পারে, যাকে হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথির বিরুদ্ধে "দণ্ডযোগ্য বিদ্রোহ" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
(ক) অর্গানন পাঠের প্রয়োজনীয়তা:
অর্গানন পাঠ ছাড়া কোনো ব্যক্তি প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হতে পারেন না। এর গুরুত্ব নিম্নরূপ:
১) এটি চিকিৎসককে আরোগ্যের সঠিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম (সদৃশ নীতি) শিক্ষা দেয়। ২) কীভাবে রোগীর সঠিক লক্ষণ সমষ্টি গ্রহণ করতে হবে তার দিকনির্দেশনা দেয়। ৩) ওষুধের মাত্রা, শক্তিকরণ এবং তা প্রয়োগের সঠিক সময় ও নিয়ম শেখায়। ৪) চিররোগের মূল কারণ মায়াজম চেনার ও তা দূর করার উপায় প্রদান করে।
(খ) অর্গাননকে 'হোমিওপ্যাথির সংবিধান' বলার কারণ:
একটি রাষ্ট্র যেমন তার সংবিধানের বাইরে গিয়ে পরিচালিত হতে পারে না এবং সংবিধান লঙ্ঘন করলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়; ঠিক তেমনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থাও অর্গানন গ্রন্থের নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সদৃশ বিধান, একক ওষুধ, সূক্ষ্ম মাত্রা, জীবনী শক্তি তত্ত্ব ইত্যাদি মৌলিক নিয়মগুলো অর্গাননে চিরস্থায়ী আইন হিসেবে লিপিবদ্ধ। এই নিয়মের বাইরে গেলে তা আর homeopathy থাকে না। তাই একে হোমিওপ্যাথির সংবিধান বলা হয়।
(গ) ৫ম ও ৬ষ্ঠ সংস্করণের পার্থক্য ও পরিবর্তনসমূহ:
মহাত্মা হ্যানিম্যান অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে বৈপ্লবিক কিছু পরিবর্তন এনেছেন, যা ৫ম সংস্করণে ছিল না। প্রধান পার্থক্যসমূহ নিচে দেওয়া হলো:
| পার্থক্যকারী বিষয় | ৫ম সংস্করণ (১৮৩৩) | ৬ষ্ঠ সংস্করণ (১৯২১ - মরণোত্তর) |
|---|---|---|
| ঔষধের শক্তির স্কেল | শততমিক পদ্ধতি (Centesimal Scale) ব্যবহার করা হতো। | পঞ্চাশ সহস্রতমিক পদ্ধতি (50 Millesimal Scale / LM Potency) প্রবর্তন করা হয়। |
| ঔষধের মাত্রা পুনরাবৃত্তি | ওষুধের মাত্রা ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। | প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম উপায়ে মাত্রা পুনরাবৃত্তির নিয়ম দেওয়া হয়। |
| জীবনী শক্তির সংজ্ঞা | একে 'Vital Force' বা জীবনী শক্তি বলা হয়েছিল। | একে আরও আধ্যাত্মিক রূপ দিয়ে 'Vital Principle' বা জীবনী নীতি বলা হয়। |
(ক) হোমিওপ্যাথির মৌলিক নীতিসমূহ:
হোমিওপ্যাথি বিজ্ঞান ৭টি প্রধান স্তম্ভ বা নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত:
১) সদৃশ নিয়ম (Law of Similia): সুস্থ দেহে যে ভেষজ যে রোগ লক্ষণ তৈরি করে, সদৃশ লক্ষণযুক্ত প্রাকৃতিক রোগীকে সেই ওষুধই আরোগ্য করে।
২) একক ওষুধ নীতি (Law of Simplex): রোগীকে এক সময়ে কেবল একটিমাত্র সরল ওষুধ দিতে হবে।
৩) সূক্ষ্ম মাত্রা নীতি (Law of Minimum): ওষুধের মাত্রা হবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম যাতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হয়।
৪) ঔষধ পরীক্ষণ (Drug Proving): ওষুধ সবসময় সুস্থ মানুষের ওপর পরীক্ষা করে লক্ষণ সংগ্রহ করতে হবে।
৫) জীবনী শক্তি তত্ত্ব (Vital Force): রোগ মূলত অদৃশ্য জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলা।
৬) মায়াজম তত্ত্ব (Theory of Miasms): সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস হলো সকল চিররোগের মূল উৎস।
৭) ঔষধের শক্তিকরণ (Potentization): ঘর্ষণ ও ঝাঁকুনির মাধ্যমে ওষুধের ভেতরের সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তি জাগ্রত করা হয়।
(খ) সদৃশ (Homeopathy) ও বিসদৃশ (Allopathy) চিকিৎসার পার্থক্য:
১) হোমিওপ্যাথি পরিচালিত হয় 'সদৃশ আরোগ্য নীতি' (Similia) দ্বারা; আর অ্যালোপ্যাথি পরিচালিত হয় 'বিসদৃশ নীতি' (Contraria) দ্বারা। ২) হোমিওপ্যাথিতে সম্পূর্ণ মানুষের (রোগীর) চিকিৎসা করা হয়; অ্যালোপ্যাথিতে নির্দিষ্ট রোগ বা আক্রান্ত অঙ্গের চিকিৎসা করা হয়। ৩) হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও একক ওষুধ ব্যবহৃত হয়; অ্যালোপ্যাথিতে স্থূল মাত্রায় একাধিক ওষুধের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। ৪) হোমিওপ্যাথি রোগের মূল কারণ দূর করে স্থায়ী আরোগ্য দেয়; অ্যালোপ্যাথি সাময়িকভাবে লক্ষণ চাপা দেয়।
(গ) অ্যান্টিপ্যাথি ও আইসোপ্যাথি:
অ্যান্টিপ্যাথি (Antipathy): এটি এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে রোগীর লক্ষণের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ওষুধ দেওয়া হয় (যেমন: কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য জোলাপ বা রেচক, পুড়ে যাওয়ার জন্য বরফ বা ঠান্ডা পানি)। এটি সাময়িক আরাম দিলেও পরবর্তীতে রোগকে আরও জটিল করে তোলে।
আইসোপ্যাথি (Isopathy): রোগ যে উপাদান বা জীবাণু দ্বারা তৈরি হয়েছে, সেই উপাদান থেকেই ওষুধ তৈরি করে চিকিৎসা করার পদ্ধতিকে আইসোপ্যাথি বলে (যেমন: ফোঁড়ার পুঁজ থেকে ওষুধ তৈরি করে সেই ফোঁড়ার চিকিৎসা করা)। এটি হোমিওপ্যাথির সদৃশ নীতি নয়, বরং সম-উপাদান নীতি।
(ক) জীবনী শক্তি ও এর কাজ এবং জড়দেহের সাথে পার্থক্য:
সংজ্ঞা: মানুষের জীবিত শরীরে যে অদৃশ্য, আধ্যাত্মিক, স্বয়ংক্রিয় এবং বুদ্ধিমান শক্তি সমস্ত দেহ ও মনকে সচল, সুসংহত ও অনুভূতিসম্পন্ন রাখে, তাকে জীবনী শক্তি বলে।
কাজ: ১) শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যাবলীর মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় রাখা। ২) রোগজীবাণু বা বাহ্যিক প্রতিকূলতা থেকে শরীরকে রক্ষা করা। ৩) সুখ, দুঃখ ও শারীরিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানো।
জড়দেহের সাথে পার্থক্য: জীবনী শক্তি একটি অদৃশ্য চেতনা ও চালিকা শক্তি, যার কোনো ওজন বা আকার নেই। আর জড়দেহ হলো রক্ত-মাংসের একটি উপাদান বা খাঁচা। জীবনী শক্তির উপস্থিতিতে জড়দেহ সচল থাকে; জীবনী শক্তি চলে গেলে জড়দেহ অলস, মৃত ও পচনশীল বস্তুতে পরিণত হয়।
(খ) উক্তি দুটির ব্যাখ্যা:
"জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলাই রোগ": হোমিওপ্যাথি মনে করে রোগ কোনো বস্তুগত উপাদান নয়। যখন কোনো অদৃশ্য মায়াজমেটিক বা বাহ্যিক কারণে শরীরের অদৃশ্য জীবনী শক্তি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারায় বা বিশৃঙ্খল হয়, তখনই শরীরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো হলো জীবনী শক্তির কান্ন বা আরোগ্যের আকুতি। অতএব, জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলাই হলো প্রকৃত রোগ।
"রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা কর": যেহেতু রোগ জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলা থেকে আসে, তাই একই রোগে আক্রান্ত বিভিন্ন মানুষের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট, আকৃতি, পছন্দ-অপছন্দ ভিন্ন হয়। হোমিওপ্যাথি রোগের নাম (যেমন: টাইফয়েড বা আলসার) দেখে সবার জন্য এক ওষুধ দেয় না, বরং সম্পূর্ণ মানুষটির সামগ্রিক লক্ষণ দেখে ওষুধ দেয়। তাই বলা হয়, রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা করতে হবে।
(গ) প্রাকৃতিক রোগ ও কৃত্রিম রোগের পার্থক্য:
প্রাকৃতিক রোগ (Natural Disease): প্রকৃতিগত মায়াজম বা প্রাকৃতির পরিবেশের প্রভাবে জীবনী শক্তি বিশৃঙ্খল হয়ে শরীরে যে রোগ তৈরি করে, তাকে প্রাকৃতিক রোগ বলে (যেমন: ম্যালেরিয়া, বসন্ত)। উপযুক্ত সদৃশ ওষুধে এটি সহজেই আরোগ্য হয়।
কৃত্রিম রোগ (Artificial Disease): দীর্ঘদিন ধরে ভুল চিকিৎসা, এলোপ্যাথিক কড়া ওষুধ বা স্থূল মাত্রায় ওষুধ সেবনের ফলে মানবদেহে যে নতুন ও অত্যন্ত জটিল রোগ লক্ষণ সৃষ্টি হয়, তাকে কৃত্রিম রোগ বলে। এই রোগগুলো সাধারণ প্রাকৃতিক রোগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং আরোগ্য করা অত্যন্ত কঠিন।
(ক) তরুণ রোগ ও এর প্রকারভেদ:
যেসব রোগ হঠাৎ করে তীব্র আকারে আক্রমণ করে, দ্রুত গতিতে অগ্রসর হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রোগীকে সুস্থতার দিকে নিয়ে যায় অথবা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, তাকে তরুণ রোগ বলে (যেমন: কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা)।
প্রকারভেদ: তরুণ রোগ প্রধানত ৩ প্রকার— ১) ব্যক্তিগত (Individual): যা কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আক্রমণ করে। ২) বিক্ষিপ্ত (Sporadic): যা একই সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এলাকার দু-চারজনকে আক্রমণ করে। ৩) মহামারী (Epidemic): যা একই সময়ে কোনো বিস্তীর্ণ এলাকার বহু মানুষকে একসাথে আক্রমণ করে।
(খ) চির রোগ ও মিথ্যা চির রোগ:
চির রোগ: যেসব রোগ অত্যন্ত ধীর ও মৃদু গতিতে শুরু হয়, সময়ের সাথে সাথে শরীরে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে এবং সঠিক হোমিওপ্যাথিক অ্যান্টি-মায়াজমেটিক চিকিৎসা ছাড়া নিজে নিজে কখনোই ভালো হয় না, তাকে চির রোগ বলে (যেমন: হাঁপানি, বাতের ব্যথা)।
মিথ্যা চির রোগ: যেসব রোগ দীর্ঘস্থায়ী হলেও মূলত কোনো অভ্যন্তরীণ মায়াজমের কারণে হয় না, বরং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব, অতিরিক্ত মদ্যপান বা কঠোর পরিশ্রমের কারণে সৃষ্টি হয়, তাকে মিথ্যা চির রোগ বলে। ক্ষতিকর পরিবেশ বা অভ্যাস পরিবর্তন করলেই এই রোগগুলো ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়।
(গ) দুটি বৈসাদৃশ্য রোগ মিলিত হলে সৃষ্ট অবস্থা:
অর্গাননের ৩৬ থেকে ৪০ সূত্রে হ্যানিম্যান বলেছেন, মানবদেহে দুটি অসদৃশ বা বৈসাদৃশ্য রোগ একসাথে উপস্থিত হলে ৩টি ঘটনা ঘটতে পারে:
১) প্রথম রোগটি শক্তিশালী হলে: নতুন আসা দুর্বল রোগটিকে শরীরে প্রবেশ করতে দেবে না, তা তাড়িয়ে দেবে।
২) নতুন রোগটি শক্তিশালী হলে: পুরাতন দুর্বল রোগটিকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ বা চাপা দিয়ে রাখবে এবং নিজের কাজ শেষ করে চলে গেলে পুরাতন রোগটি আবার দেখা দেবে।
৩) উভয় রোগ সমশক্তিসম্পন্ন হলে: তারা একে অপরকে তাড়াতে পারবে না, বরং মানবদেহের আলাদা আলাদা অঙ্গে অবস্থান করে একটি 'জটিল রোগ' (Complex Disease) তৈরি করবে।
(ক) লক্ষণ এবং লক্ষণ ও চিহ্নের পার্থক্য:
লক্ষণ: রোগাক্রান্ত অবস্থায় রোগীর শরীরে ও মনে যে সমস্ত কষ্টদায়ক ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দেয়, যা রোগী নিজে অনুভব করে এবং ডাক্তার বা চারপাশের মানুষ দেখতে পায়, তাকে লক্ষণ বলে।
পার্থক্য: লক্ষণ (Symptom) হলো রোগী নিজে যা অনুভব করে চিকিৎসকের কাছে মুখে বর্ণনা করে (যেমন: মাথাব্যথা, মনের ভয়)। আর চিহ্ন (Sign) হলো চিকিৎসক নিজে পরীক্ষা করে রোগীর শরীরে যা দেখতে বা বুঝতে পারেন (যেমন: জন্ডিসে চোখ হলুদ হওয়া, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুকের শব্দ শোনা)।
(খ) ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণের পার্থক্য:
ব্যক্তিনিষ্ঠ লক্ষণ (Subjective Symptom): এই লক্ষণগুলো কেবল রোগী নিজে অনুভব করতে পারে, বাইরের কেউ দেখতে পায় না। যেমন: রোগীর মনে হওয়া যে তার বুক ধড়ফড় করছে, বা পায়ে পিঁপড়ে হাঁটার মতো অনুভূতি হওয়া।
বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণ (Objective Symptom): এই লক্ষণগুলো রোগী নিজে না বললেও চিকিৎসক বা রোগীর আত্মীয়রা খালি চোখে দেখতে পান। যেমন: রোগীর ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল, ঠোঁট ফেটে যাওয়া, বা জিব দিয়ে লালা পড়া।
(গ) মানসিক লক্ষণ ও ওষুধ নির্বাচনে এর গুরুত্ব:
মানুষের মন ও চিন্তা জগতের সাথে সম্পর্কিত লক্ষণগুলোকে মানসিক লক্ষণ বলে (যেমন: তীব্র রাগ, একা থাকার ভয়, আত্মহত্যার ইচ্ছা, অন্ধকার প্রীতি)।
গুরুত্ব: অর্গাননের ২১০-২১২ সূত্রে হ্যানিম্যান বলেছেন, মানুষের মন হলো শরীরের চালিকা শক্তি। শারীরিক লক্ষণের চেয়ে মানসিক লক্ষণের মূল্য হোমিওপ্যাথিতে অনেক বেশি। দুটি ওষুধের শারীরিক লক্ষণ এক হলেও যদি মানসিক লক্ষণ ভিন্ন হয় (যেমন: একজন রাগী ও অন্যজন শান্ত), তবে ওষুধ সম্পূর্ণ বদলে যাবে। সঠিক ও গভীরক্রিয় ওষুধ নির্বাচনের জন্য মানসিক লক্ষণকে 'প্রথম শ্রেণীর লক্ষণ' হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
(ক) হোমিওপ্যাথিক ল-অব নেচার (প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতি):
অর্গাননের ২৬ নম্বর সূত্রে হ্যানিম্যান প্রকৃতির একটি চিরন্তন নিয়ম উল্লেখ করেছেন, যাকে হোমিওপ্যাথিক ল-অব নেচার বলা হয়। নিয়মটি হলো: "মানবদেহে একটি দুর্বল গতিশীল (dynamic) রোগ লক্ষণকে, অন্য একটি শক্তিশালী কিন্তু অত্যন্ত সদৃশ (similar) কৃত্রিম রোগ লক্ষণ স্থায়ীভাবে ধ্বংস ও আরোগ্য করতে পারে।" অর্থাৎ ওষুধের সদৃশ শক্তিশালী শক্তি রোগীর প্রাকৃতিক দুর্বল রোগকে তাড়িয়ে দিয়ে শরীরকে আরোগ্য করে।
(খ) ঔষধ শক্তি ও আরোগ্য সাধিকা ক্ষমতা:
ঔষধ শক্তি: ভেষজ উপাদানের ভেতরে যে অদৃশ্য, রোগ সৃষ্টি করার এবং রোগ দূর করার গতিশীল ক্ষমতা সুপ্ত থাকে, তাকে ঔষধ শক্তি বলে।
নির্ভরশীলতা: ওষুধের আরোগ্য সাধিকা ক্ষমতা মূলত নির্ভর করে ওষুধের 'সদৃশ লক্ষণ সৃষ্টি করার ক্ষমতার' ওপর। যে ওষুধ সুস্থ মানুষের শরীরে রোগীর কষ্টের যত বেশি সদৃশ লক্ষণ তৈরি করতে পারবে, তার আরোগ্য করার ক্ষমতা তত বেশি হবে। এছাড়া ওষুধের সূক্ষ্মতা ও সঠিক মাত্রার ওপরও এটি নির্ভর করে।
(গ) আদর্শ আরোগ্য ও এর শর্তসমূহ:
অর্গাননের ২য় সূত্রে আদর্শ আরোগ্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে: "রোগীর কষ্টকে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া দ্রুত (Rapid), মৃদু (Gentle) এবং স্থায়ীভাবে (Permanent) সম্পূর্ণ নির্মূল করাই হলো আরোগ্যের সর্বোচ্চ আদর্শ।"
প্রধান শর্তসমূহ: ১) আরোগ্য প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদী না হয়ে দ্রুত হতে হবে। ২) রোগীকে কষ্ট না দিয়ে অত্যন্ত মৃদু ও আরামদায়কভাবে রোগ দূর হতে হবে। ৩) রোগটি যেন পুনরায় ফিরে না আসে অর্থাৎ স্থায়ীভাবে মূলসহ ধ্বংস হতে হবে। ৪) এটি কোনো মনগড়া পদ্ধতিতে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক আরোগ্য নীতির ওপর ভিত্তি করে হতে হবে।
(ক) মুখ্যক্রিয়া ও গৌণক্রিয়া:
মুখ্যক্রিয়া: ওষুধ শরীরে প্রবেশ করার পর তার নিজস্ব ভেষজ ক্ষমতার কারণে প্রথমবার জীবনী শক্তির ওপর যে প্রভাব বা পরিবর্তন তৈরি করে, তাকে মুখ্যক্রিয়া বলে (যেমন: আফিম খেলে প্রথমে গভীর ঘুম আসে)।
গৌণক্রিয়া: ওষুধের মুখ্যক্রিয়া শেষ হওয়ার পর জীবনী শক্তি নিজের ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার জন্য ওষুধের বিপরীত যে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাকে গৌণক্রিয়া বলে (যেমন: আফিমের নেশা কেটে যাওয়ার পর তীব্র অনিদ্রা ও ছটফটানি হওয়া)।
(খ) একবার একটি মাত্র ঔষধ প্রয়োগের কারণ:
১) মানবদেহের জীবনী শক্তি এক ও সরল, তাই তার জন্য এক সময়ে একটি ওষুধের সরল স্পন্দনই প্রয়োজন। ২) একাধিক ওষুধ একসাথে দিলে তাদের পারস্পরিক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শরীরে নতুন জটিল কৃত্রিম রোগ তৈরি হতে পারে। ৩) মেটেরিয়া মেডিকায় প্রতিটি ওষুধ এককভাবে প্রুভিং করা হয়েছে, মিশ্র ওষুধের কোনো পরীক্ষিত লক্ষণ নেই। ৪) রোগীকে একসাথে একাধিক ওষুধ দিলে কোন ওষুধের ক্রিয়ায় রোগী ভালো হলো তা চিকিৎসক বুঝতে পারবেন না।
(গ) সূক্ষ্মমাত্রার কার্যকারিতা:
হোমিওপ্যাথিতে ওষুধের স্থূল মাত্রা রোগীকে দেওয়া হয় না, কারণ স্থূল মাত্রা রোগাক্রান্ত সংবেদনশীল অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং মারাত্মক ঔষধীয় বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। ওষুধ যত সূক্ষ্ম ও ক্ষুদ্র মাত্রার হবে, তা তত সহজে শরীরের নার্ভ ও কোষের গভীরে প্রবেশ করে অদৃশ্য জীবনী শক্তিকে মৃদুভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারবে। সূক্ষ্ম মাত্রা রোগীকে কোনো কষ্ট না দিয়ে রোগ দূর করে, তাই এটি অধিকতর কার্যকর ও নিরাপদ।
(ক) মায়াজম ও এর প্রকারভেদ:
মায়াজম হলো চিররোগের মূল বীজ বা অদৃশ্য অভ্যন্তরীণ বিষাক্ত প্রবণতা। মায়াজমের উপস্থিতি ছাড়া মানবদেহে কোনো প্রকৃত চিররোগ জন্ম নিতে পারে না। এটি বংশানুক্রমিকভাবে প্রবাহিত হয়।
প্রকারভেদ: হ্যানিম্যানের মতে মৌলিক মায়াজম ৩ প্রকার— ১) সোরা (Psora), ২) সিফিলিস (Syphilis), এবং ৩) সাইকোসিস (Sycosis)। পরবর্তীকালের চিকিৎসকরা সোরা ও সিফিলিসের মিশ্রণে আরেকটি মায়াজম চিহ্নিত করেছেন, যাকে বলা হয় টিউবারকুলার মায়াজম (Tubercular Miasm)।
(খ) সোরা মায়াজম ও এর বৈশিষ্ট্য:
সোরাকে সকল রোগের জননী বলা হয়। এটি মূলত শরীরের কার্যাবলীর মধ্যে অতি-সংবেদনশীলতা তৈরি করে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ: ১) ত্বকে তীব্র চুলকানি, একজিমা, শুষ্কতা এবং চর্মরোগ চাপা পড়ার ইতিহাস। ২) মনে তীব্র অস্থিরতা, অকারণ ভয়, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। ৩) মিষ্টি ও গরম খাবার খাওয়ার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক। ৪) গরমে বা ঘাম হলে রোগীর কষ্ট কমে যাওয়া।
(গ) টিউবারকুলার মায়াজম:
সোরা এবং সিফিলিস মায়াজমের মিলনে যে মিশ্র মায়াজমের সৃষ্টি হয়, তাকে টিউবারকুলার বা স্ক্রোফুলার মায়াজম বলা হয়। এর মূল প্রবণতা হলো ক্ষয়রোগ বা শরীরের শক্তি দ্রুত হ্রাস পাওয়া।
লক্ষণসমূহ: ১) ভালো খাওয়া-দাওয়া করার পরেও শরীর দিন দিন শুকিয়ে যাওয়া বা ওজন হ্রাস পাওয়া। ২) ঘন ঘন ঠান্ডা লাগা, সর্দি-কাশি এবং বুকে ইনফেকশন হওয়া। ৩) ঠান্ডা বাতাস বা খোলা বাতাসে থাকার তীব্র ইচ্ছা। ৪) এক জায়গায় স্থির থাকতে না পারা, ভ্রমণ করার তীব্র মানসিক ইচ্ছা (Wandering disposition)।
রোগীর দেহ ও মনের সমস্ত সাধারণ, লৈঙ্গিক, মানসিক এবং চরিত্রগত লক্ষণগুলোকে একত্রিত করে যে একটি পূর্ণাঙ্গ রোগ-চিত্র তৈরি করা হয়, তাকে লক্ষণসমষ্টি বলে। অর্গাননের ৭ম সূত্রে হ্যানিম্যান বলেছেন, একটি বা দুটি বিচ্ছিন্ন লক্ষণ দেখে কখনো ওষুধ নির্বাচন করা যায় না। রোগীর ভেতরের অদৃশ্য রোগটি বাইরে লক্ষণের সমষ্টির মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। এই লক্ষণসমষ্টিই হলো সঠিক সদৃশ ওষুধ নির্বাচনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক।
অর্গাননের ৪র্থ সূত্রে একজন আদর্শ চিকিৎসকের একটি বড় দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে, তা হলো তাকে 'স্বাস্থ্য সংরক্ষক' হতে হবে। এর অর্থ হলো, চিকিৎসক কেবল রোগ তাড়াবেন না, বরং মানুষ যাতে অসুস্থ না হয় সেই ব্যবস্থা করবেন। রোগ উৎপন্নকারী কারণগুলো (যেমন: অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, দূষিত পানি, পুষ্টিহীন খাদ্য, নোংরা পরিবেশ) চিনে সেগুলো দূর করার জন্য রোগীকে পরামর্শ দেওয়া চিকিৎসকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
ওষুধের যে সর্বনিম্ন ও ক্ষুদ্রতম পরিমাণ রোগীর বিশৃঙ্খল জীবনী শক্তিকে মৃদুভাবে উদ্দীপিত করে রোগ আরোগ্য করতে পারে, অথচ শরীরে কোনো নতুন উপদ্রব বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে না, তাকে সূক্ষ্মমাত্রা বলে। ভেষজের স্থূল উপাদানকে ঝাঁকুনি ও ঘর্ষণের (Potentization) মাধ্যমে দূর করে কেবল তার গতিশীল শক্তিটুকুকে মাত্রায় রূপান্তর করা হয়, যা হোমিওপ্যাথির একটি অন্যতম মৌলিক নীতি।
যখন কোনো সুনির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ বা তরুণ রোগ একই সময়ে কোনো বিস্তীর্ণ এলাকার বহু মানুষকে একসাথে আক্রমণ করে এবং সবার মধ্যে প্রায় একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়, তখন তাকে মহামারী রোগ বলে (যেমন: কলেরা, বসন্ত, বা ডেঙ্গু)। অর্গাননের ১০০-১০২ সূত্রে হ্যানিম্যান বলেছেন, মহামারীর চিকিৎসায় এলাকার কয়েকজন রোগীর লক্ষণ সংগ্রহ করে একটি 'Generic Remedy' বা 'Genus Epidemicus' (মহামারী নাশক ওষুধ) নির্বাচন করতে হয়, যা ঐ এলাকার সবার জন্য কার্যকর হয়।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে শাখায় ওষুধের সঠিক পরিমাণ, মাত্রা এবং তা কত সময় পর পর রোগীর শরীরে প্রয়োগ বা পুনরাবৃত্তি করতে হবে— সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে মাত্রাতত্ত্ব বা পসোলজি বলে। সঠিক ওষুধ নির্বাচনের পর সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। মাত্রা বেশি স্থূল বা ঘন ঘন হলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে, আবার মাত্রা অতিরিক্ত কম হলে আরোগ্য বিলম্বিত হতে পারে।
রোগীর সদৃশ ওষুধটি নির্বাচন করার পর এক সময়ে ওষুধের কেবল একটিমাত্র ফোঁটা বা বড়ি রোগীকে সেবন করানোকে একক মাত্রা বলে। এই একক মাত্রা দেওয়ার পর চিকিৎসকের কাজ হলো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা এবং লক্ষ করা যে জীবনী শক্তি আরোগ্যের কাজ শুরু করেছে কি না। যতক্ষণ ওষুধের ক্রিয়া চলতে থাকে, ততক্ষণ দ্বিতীয় কোনো মাত্রা দেওয়া নিষিদ্ধ।
রোগাক্রান্ত অবস্থায় রোগী যে সমস্ত খাদ্য গ্রহণ করবে এবং যে জীবনযাত্রা মেনে চলবে, তাকে পথ্য ও নিয়মাবলী বলে।
Post a Comment