আজকের শিক্ষা ডট কম (ajkershikkha.com)
--:--:--

সর্বশেষ

ইতনা ইংলিশ হাই স্কুল থেকে যেভাবে ইতনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের নামকরণ হয়েছে।


ইতনা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সময় বয়ে চলে অবিরাম, দিনের পরে মাস, মাসের পর বছর, বছরের পর যুগ, যুগের পর শতাব্দী এমনি করে সময় মিশে যায় অনন্ত কালের মধ্যে। বাংলাদেশ নদী মাতৃক দেশ। নদীর একূল ভাঙ্গে ওকূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। মধুমতি নদীর ভাঙ্গা গড়ার মধ্যেই ইতনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের জন্ম। 

ইতনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ লোহাগড়ার সর্বপ্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর স্কুল শাখা ১৯০০ সালের ২ জানুয়ারি স্থায়ী স্বীকৃতি লাভ করে বলে জানা যায়। পরবর্তীতে প্রায় ৯৫ বছর পরে ১৯৯৫ সালে এর সাথে যুক্ত হয় উচ্চ মাধ্যমিক শাখা। ভারতবর্ষের অন্যতম একটি বিদ্যাপীঠ ITNA ENGLISH HIGH SCHOOL। নদী ভাঙ্গনের ফলে স্কুলটির সূচনালগ্নের অতিত ইতিহাস মহাকালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। অনেক পুরাতন বিদ্যালয় বলে এর সঠিক ইতিহাস স্মৃতির পাতায় অনেকখানি ঝাপসা। ১৯৫৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম থেকে ENGLISH শব্দটি বাদ দিয়ে এর নতুন নামকরণ করেন ITNA HIGH SCHOOL।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যে স্থানে অবস্থিত, এটি এর পরিবর্তিত স্থান। মূল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বর্তমান স্থান থেকে প্রায় ৪০০ মিটার উত্তরে, ওয়াপদার বেড়িবাঁধের উপর। তার কিছুটা উত্তর -পূর্বে। সে প্রতিষ্ঠানটি মধুমতীর তীব্র ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মধুমতী ভাঙতে ভাঙতে বর্তমান অবস্থানের ৫০ মিটার দূরত্বের মধ্যে চলে আসে এবং হঠাৎ করে টান নিয়ে ধীরে ধীরে প্রায় এক/ দেড় কিলোমিটার উত্তরে চলে যায়। বহু আগে যেখানে মূল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেসব জায়গা জেগে ওঠে। বন্যা প্রতিরোধ কল্পে ওয়াপদা তথা, সরকার উক্ত জমি অধিগ্রহণ করে এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ স্কুলকে টাকা প্রদান করেন। তবে, উক্ত বাঁধ সংলগ্ন আরো কিছু জমি নিম্নাঞ্চলে রয়ে যায়। আজও উক্ত জমি বর্গা দেয়া বাবদ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে টাকা জমা হয়।মূল স্কুল নদীগর্ভে বিলীন হলে, মূলত ইত্নার ঐতিহ্যবাহী শিকদার বংশের জমির উপরই বর্তমান স্কুলটি গড়ে ওঠে। পরে অবশ্য অনেকেই প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করেন।    

১৯৯৫ সালের কিছু পূর্বে, সরকারি এক প্রজ্ঞাপন বলে, ইত্না ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মরহুম সরদার তসলিম উদ্দীনের উদ্যোগে এখানে কলেজ শাখা খোলার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে, কলেজ শাখা প্রতিষ্ঠা লক্ষ্যে এই স্কুলের প্রাক্তন বেশ কয়েকজন মহান ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ট্রেজারার জনাব অধ্যাপক ডঃ এ বি এম এনায়েত হোসেন স্যারকে সামনে রেখে এগিয়ে আসেন জনাব কাজী গোলাম মুস্তাফা, বাবু বাসুদেব ব্যানার্জী, জনাব শিকদার মনির আহমেদ, জনাব সরদার ফিরোজ আহমেদ, জনাব নওশেরুল ইসলাম, বাবু বিশ্বনাথ গাঙ্গুলী, বাবু গোপাল গাঙ্গুলী, জনাব আজিজ আহমেদ চৌধুরীসহ মহৎপ্রাণ অনেকেই। যাহোক, সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কলেজ শাখা অচিরেই ১৯৯৭ এর জানুয়ারি মাসে প্রথম এমপিওভুক্ত হয়।১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার কারণে অনেক প্রথিতযশা শিক্ষকই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় অনেকটা অলক্ষ্যে, অযত্নে প্রতিষ্ঠানের অনেক মূল্যবান দালিলিক প্রমাণপত্র ইঁদুরে কেটেছে, উই পোকায় কেটেছে, ছাদ ফেটে বৃষ্টির জল পড়ে বহু মূল্যবান কাগজ পত্র নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কী করে স্কুলের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধার করা যায়, সে প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রাথমিক সূত্র পাওয়া গেল প্রতিষ্ঠানের সর্বপ্রাচীন মূল একতলা ভবনের ভাঙাচূড়া লিখিত কথা থেকে। যেখানে লেখা আছে -"প্রতিষ্ঠিত ১৯০০ সালে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্থায়ীভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।"অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রায় সকল স্কুলই কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। স্থায়ীভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুলের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু ইতনা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্থায়ীভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তির পিছনে রহস্যটা কী!!অনেক ভাবোচিন্তার পর বাবু গোপাল গাঙ্গুলীকে রহস্য উদ্ধারে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঠিয়েছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারি তন্ন তন্ন করে খুঁজে পাওয়া গেল এক অনন্য ইতিহাস -"Calcutta gazette" যার নাম। সেখানে অবিভক্ত ভারতবর্ষের স্থায়ীভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল স্কুলের ইংরেজি বর্ণক্রমানুযায়ী নাম রয়েছে। অবশেষে, সেই ক্যালকাটা গেজেটে পাওয়া গেল "Itna High English School" - এর নাম। বাবু গোপাল গাঙ্গুলী সযত্নে তার একটি মূল কপি সংগ্রহ করলেন। মূল কপিটির কয়েক সেট ফটোকপি করলেন এবং প্রত্যেকটি কপি আলাদা আলাদা করে স্পাইরাল কর্ড বাইন্ডিং করলেন। এই গেজেটের কোন কপি যশোর শিক্ষা বোর্ড, বা, এই বোর্ডের অধিভুক্ত কোন স্কুলেই সংরক্ষিত ছিল না। আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যশোর বোর্ডকে এই গেজেটের একটি বাঁধাই করা কপি উপহার স্বরূপ প্রদান করা হয়। বোর্ডের চেয়ারম্যান মহোদয় আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, "এই গেজেটের কথা আমি শুনেছি। অনেক দিন ধরেই তৎকালীন প্রথিতযশা স্কুলগুলোতে এর অনুসন্ধান করেছি; কিন্তু, কারো কাছেই এর কোন কপি নেই। আজ আপনাদের কাছ থেকে এই দুর্লভ কপিটি পেয়ে বোর্ডের লাইব্রেরি আরও সমৃদ্ধ হলো।"ইতনা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষের আলমারিতে আজও এর দুটি কপি রয়েছে: একটি মূল কপি, অন্যটি ফটোকপি। দুটেই লেমিনেটিং করে স্পাইরাল কর্ড বাইন্ডিং করা। এছাড়া আছে একটি পুরাতন ভিজিটিং রেজিস্টার বুক (১৯৪৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত)। সেখানে বোর্ড -এর কলেজ ইন্সপেক্টর জনাব আবদুল ওয়াহাব সাহেবের একটি চমৎকার মন্তব্য লিখিত আছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে, উপজেলা, তথা, শহর থেকে এতো দূরে নিতান্ত গ্রামে এমন একটি সাজানো -গোছানো অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে!!

যাহোক, স্থায়ী স্বীকৃতি প্রাপ্তির পিছনের ইতিহাস অতি চমৎকার। সে বছর এন্ট্রান্স (বর্তমানে এসএসসি সমমানের) পরীক্ষায় ইতনা স্কুল থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে ১০ জন ফার্স্ট ডিভিশন এবং দুই জন সেকেন্ড ডিভিশন পেয়ে সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে ইতনা স্কুলকে দ্বিতীয় স্থান এনে দেয়। এই অসাধারণ রেজাল্ট তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে খুবই মুগ্ধ করে। এর পুরস্কার স্বরূপ মেলে স্থায়ী স্বীকৃতি। তখনকার দিনে, ইতনা স্কুল প্রায়শই এরকম রেজাল্ট করতো। জনশ্রুতি আছে ইতনা স্কুল প্রায় প্রতিবারই মহকুমার (এখন জেলা) মধ্যে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফার্স্ট হতো। তখন ইতনা স্কুলের ছেলেরা ইংরেজিতে কথা বলতেন।--- তারপর মধুমতী দিয়ে কত জল গড়িয়েছে!! নদীবন্দরগুলো শেষ হয়ে গেছে; সড়ক ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। মানুষ গ্রাম ছেড়ে ছেলেমেয়েসহ শহরমুখী হয়েছেন।** মধুমতীর স্বচ্ছ মিষ্টি জলে মিশেছে আধা-নোনা পানি: অনেকটা আজকের ইতনা স্কুলের মতো!! 


**২০১৩ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানে জে.এস.সি এবং ২০১৪ সাল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা কেন্দ্র চালু হয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্থায়ী স্বীকৃতি

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্থায়ী স্বীকৃতি


Post a Comment

Previous Post Next Post