অর্গানন অব মেডিসিন (Organon of Medicine)
ডিএইচএমএস পরীক্ষা-২০২২
দ্বিতীয় বর্ষ (বর্তমানে প্রথম বর্ষে পরীক্ষা হয়)| বিষয় কোড: ১০২
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৭৫ (যেকোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
দ্বিতীয় বর্ষ (বর্তমানে প্রথম বর্ষে পরীক্ষা হয়)| বিষয় কোড: ১০২
সময়: ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান: ৭৫ (যেকোনো ৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
১ । (ক, খ, গ)
ক) অর্গানন শব্দের আভিধানিক অর্থ কী? হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় ইহা পাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা কর।
আভিধানিক অর্থ: 'অর্গানন' (Organon) একটি গ্রীক শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হলো "কোনো বিশেষ কার্য সম্পাদনের বৈজ্ঞানিক মাধ্যম, নিয়মাবলী বা হাতিয়ার"।
পাঠের প্রয়োজনীয়তা: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অর্গানন পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। ১. এটি হোমিওপ্যাথির মূল দর্শন ও আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ২. রোগ লক্ষণ সংগ্রহ ও সদৃশ ওষুধ নির্বাচনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। ৩. ওষুধের মাত্রা ও শক্তিকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। ৪. কুসংস্কারমুক্ত হয়ে আরোগ্য কলা বা চিকিৎসাবিদ্যা প্রয়োগে চিকিৎসকের জ্ঞানকে নিখুঁত করে তোলে।
পাঠের প্রয়োজনীয়তা: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অর্গানন পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। ১. এটি হোমিওপ্যাথির মূল দর্শন ও আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। ২. রোগ লক্ষণ সংগ্রহ ও সদৃশ ওষুধ নির্বাচনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। ৩. ওষুধের মাত্রা ও শক্তিকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। ৪. কুসংস্কারমুক্ত হয়ে আরোগ্য কলা বা চিকিৎসাবিদ্যা প্রয়োগে চিকিৎসকের জ্ঞানকে নিখুঁত করে তোলে।
খ) অর্গাননের ৫ম ও ৬ষ্ঠ সংস্করণের পার্থক্যগুলো লিখ।
৫ম ও ৬ষ্ঠ সংস্করণের প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- প্রকাশকাল: ৫ম সংস্করণ ১৮৩৩ সালে এবং ৬ষ্ঠ সংস্করণ হ্যানিম্যানের মৃত্যুর পর ১৯২১ সালে প্রকাশিত হয়।
- ওষুধের শক্তি: ৫ম সংস্করণে শততমিক (Centesimal) পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে ৬ষ্ঠ সংস্করণে পঞ্চাশ সহস্রতমিক (50 Millesimal) শক্তি প্রবর্তন করা হয়েছে।
- ওষুধের মাত্রা ও প্রয়োগ: ৫ম সংস্করণে শুষ্ক ওষুধ জিহ্বায় দেওয়ার নিয়ম ছিল। ৬ষ্ঠ সংস্করণে ওষুধ পানিতে দ্রবীভূত করে ঝাঁকি দিয়ে সূক্ষ্ম মাত্রায় প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- সূত্র সংখ্যা: ৫ম সংস্করণে মোট সূত্র (Aphorism) ছিল ২৯৪টি, আর ৬ষ্ঠ সংস্করণে তা পরিবর্তিত হয়ে ২৯১টি হয়।
গ) 'অর্গানন হোমিওপ্যাথির সংবিধান'- আলোচনা কর।
একটি রাষ্ট্র যেমন নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম বা সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তেমনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাব্যবস্থাও অর্গাননের নিয়মাবলীর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। অর্গাননে হোমিওপ্যাথির মৌলিক নীতি (যেমন: সদৃশ বিধান, একক ওষুধ, সূক্ষ্ম মাত্রা) এবং চিকিৎসকের দায়িত্ব অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। এই নিয়মগুলোর বাইরে গিয়ে হোমিওপ্যাথি চর্চা করা সম্ভব নয়। অর্গানন চিকিৎসকের জন্য একটি চিরন্তন পথপ্রদর্শক, যা হোমিওপ্যাথির বিশুদ্ধতা রক্ষা করে। তাই একে হোমিওপ্যাথির সংবিধান বলা হয়।
২ । (ক, খ, গ)
ক) লক্ষণ বলতে কী বোঝ? 'লক্ষণ রোগের ভাষা'- আলোচনা কর।
লক্ষণ: মানবদেহের স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থার যেকোনো অস্বাভাবিক বা ক্ষতিকর পরিবর্তন, যা রোগী নিজে অনুভব করে, চারপাশের মানুষ দেখে এবং চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করেন, তাকে লক্ষণ বলে।
লক্ষণ রোগের ভাষা: রোগ কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়, এটি একটি অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা। রোগ তার এই অভ্যন্তরীণ কষ্টের কথা বাহ্যিক লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ করে। যেমন একটি শিশু কথা বলতে না পারলেও কান্নার মাধ্যমে তার কষ্ট প্রকাশ করে, তেমনি রোগ লক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসকের কাছে তার স্বরূপ প্রকাশ করে। লক্ষণ ছাড়া রোগ চেনা অসম্ভব, তাই লক্ষণকে রোগের ভাষা বলা হয়।
লক্ষণ রোগের ভাষা: রোগ কোনো দৃশ্যমান বস্তু নয়, এটি একটি অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা। রোগ তার এই অভ্যন্তরীণ কষ্টের কথা বাহ্যিক লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ করে। যেমন একটি শিশু কথা বলতে না পারলেও কান্নার মাধ্যমে তার কষ্ট প্রকাশ করে, তেমনি রোগ লক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসকের কাছে তার স্বরূপ প্রকাশ করে। লক্ষণ ছাড়া রোগ চেনা অসম্ভব, তাই লক্ষণকে রোগের ভাষা বলা হয়।
খ) 'জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলাই রোগ'- আলোচনা কর।
মহাত্মা হ্যানিম্যানের মতে, মানুষের দেহে একটি অদৃশ্য, আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিমান শক্তি কাজ করে, যাকে 'জীবনী শক্তি' (Vital Force) বলে। এই জীবনী শক্তি যখন কোনো প্রতিকূল বা মায়াজমেটিক কারণে আক্রান্ত বা বিকৃত হয়, তখন দেহের স্বাভাবিক কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটে। এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলারই বাহ্যিক বহিঃপ্রকাশ হলো রোগ লক্ষণ। অর্থাৎ, রোগ বাহ্যিক কোনো অঙ্গের একক সমস্যা নয়, বরং সম্পূর্ণ জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খল অবস্থার নামই রোগ।
গ) রোগ সম্পর্কে হোমিওপ্যাথির ধারণা কী?
হোমিওপ্যাথির মতে রোগ কোনো জড় বা বস্তুগত উপাদান নয়। রোগ হলো মূলত জীবনী শক্তির একটি গতিশীল, আধ্যাত্মিক এবং অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা (Dynamic Derangement)। হোমিওপ্যাথি কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গের চিকিৎসায় বিশ্বাস করে না, বরং এটি "রোগীর চিকিৎসা করে, রোগের নয়" (Treat the patient, not the disease)। মায়াজম (সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস) হলো সমস্ত চিররোগের মূল কারণ। লক্ষণ সমষ্টি দূর করার মাধ্যমেই রোগীকে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত করা সম্ভব।
৩ । (ক, খ, গ)
ক) ভেষজ শক্তি কী? আলোচনা কর।
প্রকৃতিতে প্রাপ্ত বিভিন্ন জড় বা জীবজ উপাদানের (যেমন: গাছপালা, খনিজ ইত্যাদি) মধ্যে মানুষের রোগাক্রান্ত জীবনী শক্তিকে প্রভাবিত করার বা লক্ষণ তৈরি করার যে সুপ্ত ক্ষমতা থাকে, তাকে ভেষজ শক্তি (Drug Power) বলে। সাধারণ অবস্থায় এই শক্তি সুপ্ত থাকে। কিন্তু হোমিওপ্যাথির বিশেষ শক্তিকরণ বা পোটেনটাইজেশন (Potentisation) পদ্ধতির মাধ্যমে এই সুপ্ত ভেষজ শক্তিকে জাগিয়ে তুলে একটি গতিশীল বা আধ্যাত্মিক আরোগ্যকারী শক্তিতে রূপান্তর করা হয়।
খ) 'রোগের চেয়ে ওষুধ শক্তিশালী'- আলোচনা কর।
প্রাকৃতিক রোগগুলো মানুষের শরীরে অনিয়ন্ত্রিত এবং আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে, যা জীবনী শক্তি সবসময় প্রতিরোধ করতে পারে না। কিন্তু ওষুধের শক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের শক্তি বা মাত্রা বাড়িয়ে বা কমিয়ে প্রয়োগ করতে পারেন। সদৃশ ওষুধ যখন শরীরে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা প্রাকৃতিক রোগের চেয়ে কিছুটা তীব্র কিন্তু কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে পূর্বের প্রাকৃতিক রোগটিকে স্থানচ্যুত ও বিনষ্ট করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের কারণেই বলা হয়, আরোগ্য ক্ষেত্রে রোগের চেয়ে ওষুধ শক্তিশালী।
গ) 'ওষুধ নির্বাচনের জন্য লক্ষণসমষ্টি একমাত্র পথ প্রদর্শক'- ব্যাখ্যা কর।
হোমিওপ্যাথিতে কোনো একটি মাত্র লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ দেওয়া যায় না। রোগীর শারীরিক, মানসিক, সাধারণ এবং চারিত্রিক সমস্ত লক্ষণের সামগ্রিক রূপকে 'লক্ষণসমষ্টি' (Totality of Symptoms) বলে। যেহেতু রোগ একটি অদৃশ্য শক্তি এবং তা লক্ষণসমষ্টির মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করে, সেহেতু সদৃশ ওষুধ খুঁজে বের করার জন্য এই লক্ষণসমষ্টিই চিকিৎসকের একমাত্র বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক। লক্ষণসমষ্টির অবিকল সদৃশ ওষুধই রোগীকে আরোগ্য করতে পারে।
৪ । (ক, খ, গ)
ক) ওষুধের মুখ্যক্রিয়া ও গৌণক্রিয়া বলতে কী বোঝ?
মুখ্যক্রিয়া (Primary Action): শরীরে ওষুধ প্রয়োগ করার পর ওষুধের নিজস্ব শক্তির কারণে জীবনী শক্তির ওপর যে প্রথম ও প্রত্যক্ষ প্রভাব বা পরিবর্তন দেখা যায়, তাকে মুখ্যক্রিয়া বলে। এটি মূলত ওষুধের কাজ।
গৌণক্রিয়া (Secondary Action): মুখ্যক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় জীবনী শক্তি নিজের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যে স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপরীতমুখী কাজ করে, তাকে গৌণক্রিয়া বলে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ওষুধের মুখ্যক্রিয়া ও জীবনী শক্তির গৌণক্রিয়া পরস্পর মিলে আরোগ্য সম্পন্ন করে।
গৌণক্রিয়া (Secondary Action): মুখ্যক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ায় জীবনী শক্তি নিজের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য যে স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপরীতমুখী কাজ করে, তাকে গৌণক্রিয়া বলে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় ওষুধের মুখ্যক্রিয়া ও জীবনী শক্তির গৌণক্রিয়া পরস্পর মিলে আরোগ্য সম্পন্ন করে।
খ) প্রাকৃতিক রোগ ও কৃত্রিম রোগের পার্থক্য লেখ।
| বিষয় | প্রাকৃতিক রোগ (Natural Disease) | কৃত্রিম রোগ (Artificial Disease) |
|---|---|---|
| উৎস | প্রাকৃতিক কুপ্রভাব বা মায়াজমের কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে। | ওষুধ বা ভেষজ সেবনের ফলে মানবদেহে সৃষ্টি হয়। |
| নিয়ন্ত্রণ | এটি মানুষের বা চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। | এটি চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে (মাত্রা বাড়ানো/কমানো যায়)। |
| স্থায়িত্ব | ওষুধ না দিলে এটি দীর্ঘস্থায়ী বা চিররোগে রূপ নিতে পারে। | ওষুধ বন্ধ করে দিলে সাধারণত এর কার্যকাল শেষ হয়ে যায়। |
গ) হোমিওপ্যাথিক ল-অব নেচার বলতে কী বোঝ?
হোমিওপ্যাথিক 'ল-অব নেচার' বা প্রকৃতির আরোগ্য নীতি হলো: "Similia Similibus Curentur" অর্থাৎ, "সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে"। প্রকৃতিতে দুটি অসম বা বিসদৃশ রোগ একে অপরকে আরোগ্য করতে পারে না। কিন্তু একটি দুর্বল গতিশীল রোগ যদি তার চেয়ে শক্তিশালী অন্য একটি সদৃশ গতিশীল রোগের সম্মুখীন হয়, তবে প্রথম রোগটি স্থায়ীভাবে দূর হয়ে যায়। এই প্রাকৃতিক সত্যের ওপর ভিত্তি করেই হোমিওপ্যাথি ওষুধ তৈরি ও প্রয়োগ করা হয়।
৫ । (ক, খ, গ)
ক) আরোগ্য শিল্পে যে তিনটি জ্ঞাতব্য বিষয় রয়েছে, উহা আলোচনা কর।
অর্গাননের ৩ নং সূত্র অনুযায়ী একজন আদর্শ চিকিৎসকের আরোগ্য শিল্পে সাফল্যের জন্য তিনটি প্রধান বিষয় জানা আবশ্যক:
- রোগের জ্ঞান (Knowledge of Disease): রোগীর মধ্যে ঠিক কী আরোগ্য করতে হবে বা রোগটির প্রকৃত স্বরূপ ও লক্ষণ কী, তা জানা।
- ওষুধের জ্ঞান (Knowledge of Medicinal Powers): প্রতিটি ওষুধের নিজস্ব রোগ উৎপাদন ও আরোগ্য করার ক্ষমতা বা ভেষজ গুণাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা।
- প্রয়োগের জ্ঞান (Knowledge of Application): রোগীর রোগ লক্ষণের সাথে ওষুধের লক্ষণের সদৃশতা বিধান করে সঠিক ওষুধ, সঠিক শক্তি ও সঠিক সূক্ষ্ম মাত্রায় প্রয়োগ করার কৌশল জানা।
খ) 'সোরা সকল রোগের জননী'- ব্যাখ্যা কর।
মহাত্মা হ্যানিম্যানের মায়াজম তত্ত্বে 'সোরা' (Psora) হলো আদি ও মৌলিক মায়াজম। মানুষের শরীরে যত রকমের দীর্ঘস্থায়ী বা চিররোগ দেখা যায়, তার শতকরা ৮৫ ভাগের মূলে রয়েছে এই সোরা। এটি মানুষের জীবনী শক্তিকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল, সংবেদনশীল ও রোগপ্রবণ করে তোলে। সোরা সক্রিয় না হলে সিফিলিস বা সাইকোসিস মায়াজমও দেহে বাসা বাঁধতে পারে না। প্রায় সমস্ত চর্মরোগ, মানসিক রোগ এবং জটিল শারীরিক ব্যাধির আদি উৎস সোরা হওয়ায় একে "সকল রোগের জননী" বলা হয়।
গ) রোগ কীভাবে আরোগ্য হয়?
হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য নীতি অনুযায়ী, রোগীর লক্ষণসমষ্টির সাথে মিল রেখে অত্যন্ত সদৃশ এবং সূক্ষ্ম মাত্রার একটি ওষুধ নির্বাচন করা হয়। এই ওষুধটি শরীরে প্রাকৃতিক রোগের চেয়ে কিছুটা শক্তিশালী কিন্তু কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে। ফলে জীবনী শক্তি প্রাকৃতিক রোগটির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। পরবর্তীতে ওষুধের শক্তি বা কৃত্রিম রোগটি যখন নিজে থেকেই স্তিমিত হয়ে যায়, তখন জীবনী শক্তি আবার তার স্বাভাবিক, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরে আসে। এভাবেই রোগ স্থায়ীভাবে আরোগ্য হয়।
৬ । (ক, খ, গ)
ক) হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার তত্ত্ব আলোচনা কর।
হোমিপ্যাথিক চিকিৎসার মূল তত্ত্ব হলো সদৃশ বিধান বা "লাইক কিওরস লাইক"। এর মূল ভিত্তিগুলো হলো: ১. সুস্থ মানবদেহে ওষুধ পরীক্ষা (Drug Proving) করে লক্ষণ জানা। ২. একক ও বিশুদ্ধ ওষুধ নির্বাচন করা। ৩. ওষুধের অতি সূক্ষ্ম মাত্রা (Minimum Dose) ব্যবহার করা, যাতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হয়। ৪. রোগাক্রান্ত অঙ্গের চিকিৎসা না করে সমগ্র মানুষের (Patient হিসেবে) চিকিৎসা করা এবং জীবনী শক্তির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
খ) একই মানবদেহে দুইটি বৈসাদৃশ্য রোগ মিলিত হলে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়?
অর্গাননের সূত্র অনুযায়ী, একই শরীরে দুটি বিসদৃশ বা অসমান রোগ একসঙ্গে মিলিত হলে তিনটি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে:
- প্রথম অবস্থা: পূর্বের রোগটি যদি নতুন রোগের চেয়ে শক্তিশালী হয়, তবে নতুন রোগটিকে শরীরে প্রবেশ করতে দেয় না বা প্রতিহত করে।
- দ্বিতীয় অবস্থা: নতুন রোগটি যদি পূর্বের রোগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়, তবে পূর্বের রোগটি সাময়িকভাবে স্থগিত (Suspended) থাকে এবং নতুন রোগটি নিজের লক্ষণ প্রকাশ করে। নতুন রোগটি ভালো হলে পুরনো রোগটি আবার ফিরে আসে।
- তৃতীয় অবস্থা: দুটি রোগই যদি সমান শক্তিশালী হয়, তবে তারা দেহে একসাথে অবস্থান করে একটি জটিল বা মিশ্র রোগ (Complex Disease) তৈরি করে।
গ) কী কী কারণে তরুণ রোগের চিকিৎসা সহজসাধ্য?
তরুণ রোগ (Acute Disease) দ্রুত আসে এবং দ্রুত শেষ হয়। এর চিকিৎসা সহজসাধ্য হওয়ার কারণগুলো হলো: ১. তরুণ রোগের লক্ষণগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট, তীব্র এবং সুনির্দিষ্ট হয়, যার ফলে ওষুধ নির্বাচন করা সহজ হয়। ২. এই রোগগুলোতে গভীর কোনো মায়াজমেটিক জটিলতা (যেমন দীর্ঘস্থায়ী সোরা বা সিফিলিস) সাধারণত সক্রিয় থাকে না। ৩. রোগীর জীবনী শক্তি এই রোগের বিরুদ্ধে দ্রুত সাড়া দেয় এবং সদৃশ ওষুধ পেলে খুব অল্প সময়ে শরীর নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে।
৭ । (ক, খ, গ)
ক) অ্যান্টিপ্যাথি ও আইসোপ্যাথি বলতে কী বোঝ?
অ্যান্টিপ্যাথি (Antipathy): এটি একটি বিপরীতধর্মী চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে রোগের লক্ষণের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী ওষুধ প্রয়োগ করা হয় (যেমন- কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য জোলাপ বা পুড়িয়া যাওয়া স্থানে বরফ দেওয়া)। এর ফল সাময়িক এবং পরে রোগ আরও বেড়ে যায়।
আইসোপ্যাথি (Isopathy): এই পদ্ধতিতে যে জিনিস দ্বারা রোগ সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই জিনিসটি দিয়েই চিকিৎসা করা হয় (যেমন- কুকুরের কামড়ের চিকিৎসায় কুকুরের লালা থেকে তৈরি ওষুধ দেওয়া)। এটি হোমিওপ্যাথির "সদৃশ" নীতি নয়, বরং "একই" নীতি, যা অনেক সময় বিপজ্জনক হতে পারে।
আইসোপ্যাথি (Isopathy): এই পদ্ধতিতে যে জিনিস দ্বারা রোগ সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই জিনিসটি দিয়েই চিকিৎসা করা হয় (যেমন- কুকুরের কামড়ের চিকিৎসায় কুকুরের লালা থেকে তৈরি ওষুধ দেওয়া)। এটি হোমিওপ্যাথির "সদৃশ" নীতি নয়, বরং "একই" নীতি, যা অনেক সময় বিপজ্জনক হতে পারে।
খ) মহামারী রোগ বলতে কী বোঝ? ইহার বৈশিষ্ট্য লেখ।
মহামারী রোগ (Epidemic Disease): যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো সংক্রামক রোগ একটি বিস্তীর্ণ এলাকার বহুসংখ্যক মানুষকে একসাথে আক্রমণ করে এবং একই রকম লক্ষণ প্রকাশ করে, তখন তাকে মহামারী রোগ বলে।
বৈশিষ্ট্য: ১. এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২. আক্রান্ত সকল রোগীর মধ্যে প্রায় একই ধরনের প্রধান লক্ষণ সমষ্টি দেখা যায়। ৩. এটি একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ, আবহাওয়া বা সংক্রামক জীবাণুর কারণে ঘটে। ৪. এই রোগের চিকিৎসায় সমস্ত রোগীর লক্ষণ বিশ্লেষণ করে একটি সাধারণ ওষুধ বা 'জিনিয়াস এপিডেমিকাস' (Genius Epidemicus) নির্বাচন করা হয়।
বৈশিষ্ট্য: ১. এটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ২. আক্রান্ত সকল রোগীর মধ্যে প্রায় একই ধরনের প্রধান লক্ষণ সমষ্টি দেখা যায়। ৩. এটি একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ, আবহাওয়া বা সংক্রামক জীবাণুর কারণে ঘটে। ৪. এই রোগের চিকিৎসায় সমস্ত রোগীর লক্ষণ বিশ্লেষণ করে একটি সাধারণ ওষুধ বা 'জিনিয়াস এপিডেমিকাস' (Genius Epidemicus) নির্বাচন করা হয়।
গ) মিথ্যা চিররোগ বলতে কী বোঝ?
যেসব দীর্ঘস্থায়ী রোগ কোনো অভ্যন্তরীণ মায়াজমের কারণে সৃষ্টি হয় না, বরং রোগীর দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ভেজাল ও পুষ্টিহীন খাদ্য গ্রহণ, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস বা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের কারণে সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে মিথ্যা চিররোগ (Pseudo-Chronic Disease) বলে। এই রোগগুলোর জন্য গভীর ক্রিয়াশীল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রয়োজন হয় না; কেবল জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন, ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করলেই এই রোগগুলো নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়।
৮ । সংক্ষেপে লিখ (টীকা):
ক) একক মাত্রা (Single Dose)
হোমিওপ্যাথির অন্যতম মূল নীতি হলো রোগীকে একসাথে একাধিক ওষুধ বা এক ওষুধের বারবার মাত্রা দেওয়া যাবে না। সদৃশ ওষুধটি নির্বাচন করার পর তার একটি মাত্র সূক্ষ্মতম ডোজ রোগীকে দেওয়া উচিত এবং এর কার্যকারিতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। একেই একক মাত্রা বলে। এটি জীবনী শক্তিকে অতিরিক্ত উত্তেজিত না করে আরোগ্য ত্বরান্বিত করে।
খ) বিক্ষিপ্ত রোগ (Sporadic Disease)
যেসব সংক্রামক রোগ মহামারীর মতো ব্যাপক আকারে না ছড়িয়ে, কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে এখানে-সেখানে দু-একজন মানুষকে বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্তভাবে আক্রমণ করে, তাকে বিক্ষিপ্ত রোগ বলে। আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন বা ব্যক্তিগত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব এর কারণ হতে পারে।
গ) চিকিৎসকের উদ্দেশ্য (Physician's Mission)
অর্গাননের ১ম সূত্র অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের একমাত্র ও মহৎ উদ্দেশ্য বা মিশন হলো রোগাক্রান্ত মানুষকে সুস্থ করে তোলা বা পূর্বের স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেওয়া, যাকে আরোগ্য (To restore the sick to health, to cure) বলা হয়। কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব তৈরি বা পাণ্ডিত্য প্রদর্শন চিকিৎসকের উদ্দেশ্য নয়।
ঘ) অমোঘ ওষুধ (Specific Remedy)
হোমিওপ্যাথিতে কোনো রোগের নামে নির্দিষ্ট কোনো অমোঘ ওষুধ নেই। তবে যখন কোনো রোগীর পূর্ণাঙ্গ লক্ষণসমষ্টির সাথে কোনো একটি ওষুধের লক্ষণ সম্পূর্ণ ও নিখুঁতভাবে মিলে যায় এবং যা প্রয়োগ করলে রোগটি নিশ্চিতভাবে আরোগ্য হয়, তখন সেই রোগীর জন্য সেই নির্দিষ্ট ওষুধটিকে অমোঘ ওষুধ বা স্পেসিফিক রেমেডি বলা হয়।
ঙ) রোগের উত্তেজক কারণ (Exciting Cause)
যেসব বাহ্যিক বা সাময়িক কারণের জন্য শরীরে হঠাৎ করে কোনো তরুণ রোগের (Acute disease) সৃষ্টি হয়, তাকে উত্তেজক কারণ বলে। যেমন- ঠাণ্ডা লাগা, বৃষ্টিতে ভেজা, বাসি খাবার খাওয়া বা অতিরিক্ত গরমের কারণে অসুস্থ হওয়া। চিকিৎসা করার সময় এই উত্তেজক কারণটি দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
Post a Comment