আজকের শিক্ষা ডট কম (ajkershikkha.com)
--:--:--

সর্বশেষ

DHMS পরীক্ষার ২০১৯ সালের প্রশ্ন ও উত্তর: হোমিওপ্যাথির নিয়ম-নীতি: প্রথম বর্ষ।

ডিএইচএমএস পরীক্ষা - প্রিন্সিপল অব হোমিওপ্যাথি উত্তরপত্র

ডিএইচএমএস পরীক্ষা - ২০১৯
প্রিন্সিপল অব হোমিওপ্যাথি (প্রথম বর্ষ)

বিষয় কোড : ১০১ | সময় : ৩ ঘণ্টা | পূর্ণমান : ৭৫
১। প্রশ্নাবলী:
ক) হোমিওপ্যাথি নিয়মনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞান মূলত কিছু শাশ্বত ও প্রাকৃতিক নিয়মরীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই নিয়মনীতি পাঠের মূল প্রয়োজনীয়তা নিচে দেওয়া হলো:
  • সঠিক চিকিৎসা প্রয়োগ: হোমিওপ্যাথির মূল নীতি 'সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে' (Similia Similibus Curentur)। এটি না জানলে সঠিক ওষুধ নির্বাচন অসম্ভব।
  • ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ: হোমিওপ্যাথির সূক্ষ্ম মাত্রার তত্ত্ব বা ডাইলুশন প্রক্রিয়া বুঝতে নিয়মনীতি জানা আবশ্যক, যা রোগীকে ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা করে।
  • আদর্শ আরোগ্য লাভ: রোগীর শারীরিক ও মানসিক লক্ষণকে মূল্যায়ন করে কীভাবে স্থায়ী ও মৃদু উপায়ে রোগ নির্মূল করা যায়, তা এই নীতি পাঠের মাধ্যমেই শেখা যায়।
  • ভুল চিকিৎসা রোধ: এলোমেলো বা মনগড়া চিকিৎসা পদ্ধতি পরিহার করে আদর্শ চিকিৎসকের গুণাবলী অর্জনে এটি দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
খ) রোগ সম্বন্ধে হোমিওপ্যাথির ধারণা দাও।
প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে রোগ সম্বন্ধে হোমিওপ্যাথির ধারণায় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। হোমিওপ্যাথির মূল কথা হলো—রোগ কোনো বাহ্যিক বা স্থানীয় বিষয় নয়।
  • জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলা: মানুষের শরীরে একটি অদৃশ্য চালিকা শক্তি থাকে, যাকে 'জীবনী শক্তি' বা Vital Force বলা হয়। এই জীবনী শক্তি যখন কোনো কারণে বিশৃঙ্খল বা কলুষিত হয়, তখনই মানুষ অসুস্থ হয়।
  • লক্ষণই রোগের প্রকাশ: জীবনী শক্তির এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা যখন বাইরে শারীরিক ও মানসিক লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তাকেই হোমিওপ্যাথি 'রোগ' বলে।
  • সামগ্রিক অসুস্থতা: হোমিওপ্যাথি কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের রোগকে আলাদা করে দেখে না, বরং পুরো মানুষটিকে অসুস্থ মনে করে। তাই বলা হয়, "হোমিপ্যাথিতে রোগের নয়, রোগীর চিকিৎসা করা হয়।"
গ) হোমিওপ্যাথি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি—প্রমাণ কর।
হোমিওপ্যাথি কেবল একটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক। এর কারণসমূহ নিম্নরূপ:
  • প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত: এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম 'সদৃশ বিধান'-এর ওপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত।
  • ওষুধের পরীক্ষণ (Drug Proving): হোমিওপ্যাথির ওষুধগুলো কাল্পনিক নয়, বরং সুস্থ মানবদেহে পরীক্ষা (Proving) করে এর কার্যকারিতা ও লক্ষণসমূহ নথিবদ্ধ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি।
  • একক ওষুধ নীতি: মিশ্র ওষুধের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ঝুঁকি এড়াতে হোমিওপ্যাথিতে এক সময়ে একটি মাত্র সরল ওষুধ প্রয়োগের বিধান রয়েছে, যা যুক্তিযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত।
  • পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল: ডা. হ্যানিম্যান বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যুক্তি এবং প্রমাণের মাধ্যমে এই চিকিৎসা ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আরোগ্য লাভই এর অন্যতম বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
২। প্রশ্নাবলী:
ক) চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনার অবদান সম্বন্ধে লিখ।
মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী আবু আলী ইবনে সিনা (অ্যাভিসেনা) চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর প্রধান অবদানসমূহ:
  • আল-কানুন ফিত-তিব: তাঁর রচিত 'আল-কানুন ফিত-তিব' (The Canon of Medicine) চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক বিশ্বকোষ। এটি বহু শতাব্দী ধরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
  • সংক্রামক রোগ আবিষ্কার: তিনিই প্রথম চিহ্নিত করেন যে যক্ষ্মা একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং এটি পানি ও মাটির মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
  • মনোদৈহিক চিকিৎসা: মানসিক অবস্থার সাথে শারীরিক সুস্থতার যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা তিনি সফলভাবে প্রমাণ ও প্রয়োগ করেন।
  • ফার্মাকোলজি: প্রায় ৭৬০টি ওষুধের গুণাগুণ, কার্যকারিতা ও মিশ্রণ নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করে গিয়েছেন, যা আধুনিক চিকিৎসায় পথ দেখিয়েছে।
খ) হ্যানিম্যান কিভাবে হোমিওপ্যাথি আবিষ্কার করেন?
হোমিওপ্যাথির আবিষ্কার এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৭৯০ সালে ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান যখন স্কটল্যান্ডের চিকিৎসক ডা. উইলিয়াম কালেনের 'মেটেরিয়া মেডিকা' গ্রন্থটি অনুবাদ করছিলেন, তখন একটি তথ্য তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বইটিতে লেখা ছিল—'সিঙ্কোনা গাছের ছাল তিতা বলেই তা ম্যালেরিয়া জ্বর ভালো করে।'
হ্যানিম্যান এই যুক্তি মেনে নিতে পারেননি। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি নিজেই সুস্থ অবস্থায় সিঙ্কোনা ছালের রস সেবন করতে শুরু করেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেল, তাঁর শরীরে ম্যালেরিয়া জ্বরের মতো হুবহু লক্ষণ দেখা দিয়েছে। সিঙ্কোনা সেবন বন্ধ করলে লক্ষণ চলে যায়। এর থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন যে, "যে উপাদান সুস্থ মানুষের শরীরে যে রোগ সৃষ্টি করতে পারে, সেই উপাদানই সদৃশ রোগাক্রান্ত মানুষের শরীরে প্রয়োগ করলে রোগ আরোগ্য হয়।" এই যুগান্তকারী সত্যের ওপর ভিত্তি করেই ১৭৯৬ সালে তিনি হোমিওপ্যাথি আবিষ্কার করেন।
গ) চিকিৎসা বিজ্ঞানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনা কর।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস মানব সভ্যতার মতোই প্রাচীন:
  • আদিম যুগ: প্রাচীনকালে মানুষ রোগব্যাধিকে ভূত-প্রেত বা ঈশ্বরের অভিশাপ মনে করত এবং গাছগাছড়া ও ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে চিকিৎসা করত।
  • গ্রিক ও রোমান যুগ: চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস প্রথম কুসংস্কার দূর করে রোগকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। পরবর্তীতে গ্যালেন অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির ভিত্তি স্থাপন করেন।
  • ইসলামী স্বর্ণযুগ: ৮ম থেকে ১৩শ শতাব্দীতে আল-রাজি ও ইবনে সিনা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, হাসপাতাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করেন।
  • আধুনিক যুগ: উইলিয়াম হার্ভে কর্তৃক রক্তসঞ্চালন আবিষ্কার, এডওয়ার্ড জেনারের গুটিবসন্তের টিকা এবং ডা. হ্যানিম্যান কর্তৃক হোমিওপ্যাথির আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব আনে। পরবর্তীতে পেনিসিলিন ও প্রযুক্তির উন্নয়ন একে বর্তমান রূপ দেয়।
৩। প্রশ্নাবলী:
ক) হোমিওপ্যাথিতে রোগ সম্বন্ধে ধারণা কী?
(দ্রষ্টব্য: এই প্রশ্নটি ১-এর 'খ' প্রশ্নের অনুরূপ। ৫ নম্বরের জন্য এটি সংক্ষেপে নিচে দেওয়া হলো)
হোমিওপ্যাথিক দর্শন অনুযায়ী, রোগ কোনো জড় পদার্থ বা নির্দিষ্ট অঙ্গের স্থানীয় বিকৃতি নয়। মানুষের শরীর, মন ও আত্মাকে সচল রাখে এক অদৃশ্য জীবনী শক্তি (Vital Force)। কোনো কারণে এই জীবনী শক্তি অভ্যন্তরীণভাবে বিশৃঙ্খল বা রোগাক্রান্ত হলে শরীরে বৈরী লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই সামগ্রিক লক্ষণসমষ্টি বা অসঙ্গতিই হলো রোগ। রোগকে দূর করতে হলে বাইরে থেকে কৃত্রিমভাবে দমন না করে, জীবনী শক্তিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়।
খ) কোড অব হোমিওপ্যাথিক ইথিক্স বর্ণনা কর।
হোমিওপ্যাথিক ইথিক্স বা চিকিৎসা নৈতিকতা হলো একজন আদর্শ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পালনীয় কর্তব্য ও আচরণ বিধি:
  • রোগীর প্রতি কর্তব্য: রোগীকে সর্বোচ্চ মনোযোগ ও সহানুভূতির সাথে দেখতে হবে। বর্ণ, ধর্ম বা আর্থিক অবস্থাভেদে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব।
  • পেশাগত সততা: কোনো অলৌকিক বা মিথ্যা চিকিৎসার দাবি করা যাবে না। অর্গাননের নিয়মের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করা যাবে না।
  • সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা: অন্যান্য সমপেশার চিকিৎসকদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং অনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া যাবে না।
  • সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব: জনস্বাস্থ্য রক্ষায় মহামারী বা যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে সরকারকে ও সমাজকে সঠিক পরামর্শ ও সেবা দিয়ে সহযোগিতা করা।
গ) আরোগ্য কলা হিসেবে হোমিওপ্যাথির মূল্যায়ন কর।
হোমিয়োপ্যাথি কেবল একটি বিজ্ঞান নয়, এটি একটি সূক্ষ্ম 'আরোগ্য কলা' বা Art of Healing। এর মূল্যায়নে বলা যায়:
  • ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যিকরণ (Individualization): দুইজন সমলক্ষণযুক্ত রোগীর জন্য একই ওষুধ না দিয়ে, প্রত্যেকের মানসিক অবস্থা, পছন্দ-অপছন্দ বিচার করে আলাদা ওষুধ নির্বাচন করা একটি শিল্প।
  • মৃদু ও স্থায়ী আরোগ্য: রোগীকে কষ্ট না দিয়ে, কোনো তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই আলতোভাবে ভেতরের রোগশক্তিকে বের করে আনা হোমিওপ্যাথির অন্যতম শৈল্পিক গুণ।
  • সামগ্রিক কল্যাণ: এটি কেবল সাময়িকভাবে রোগ চাপা দেয় না, বরং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, যা একে একটি উচ্চাঙ্গের আরোগ্য কলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
৪। প্রশ্নাবলী:
ক) 'লক্ষণই রোগের পরিচয়'—ব্যাখ্যা কর।
যেহেতু মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবনী শক্তিকে খালি চোখে দেখা যায় না, তাই তা বিশৃঙ্খল হলে শরীরে যে কষ্ট, বেদনা, বা পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হয়, তাকেই 'লক্ষণ' বলে। ডা. হ্যানিম্যানের মতে, লক্ষণই হলো রোগের একমাত্র ভাষা। রোগ তার নিজের অস্তিত্ব প্রকাশের জন্য লক্ষণের সাহায্য নেয়। যেমন—জ্বর, কাশি, অনিদ্রা, মানসিক উৎকণ্ঠা ইত্যাদি হলো ভেতরের অসুস্থতার বাহ্যিক রূপ। এই লক্ষণ সমষ্টিকে (Totality of Symptoms) দূর করতে পারলে ভেতরের মূল রোগটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যায়। তাই বলা হয়, লক্ষণই রোগের প্রকৃত পরিচয়।
খ) প্রকৃত লক্ষণের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।
হোমিওপ্যাথিতে ওষুধ নির্বাচনের জন্য সাধারণ লক্ষণ নয়, 'প্রকৃত বা চরিত্রগত লক্ষণ' (Characteristic Symptoms) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
  • একক ও স্বাতন্ত্র্যসূচক: এই লক্ষণ রোগীকে অন্য সাধারণ রোগী থেকে আলাদা করে (যেমন: সব জ্বরে তৃষ্ণা থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় তৃষ্ণা পাওয়া চরিত্রগত লক্ষণ)।
  • মানসিক গভীরতা: রোগীর মানসিক অবস্থা, মেজাজ, ভয়, বা রাগ এর অন্তর্ভুক্ত থাকে।
  • বৃদ্ধি ও উপশম (Modalities): রোগটি কিসে বাড়ে (যেমন: গরমে, ঠান্ডায়, নড়াচড়ায়) এবং কিসে কমে, তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।
  • অদ্ভুত ও বিরল লক্ষণ: যা সচরাচর দেখা যায় না (যেমন: প্রচণ্ড জ্বরেও তৃষ্ণাহীনতা)।
গ) হোমিওপ্যাথিটিকে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা বলা হয় কেন?
হোমিয়োপ্যাথিতে রোগের কোনো প্যাথলজিক্যাল নাম (যেমন: টাইফয়েড, আলসার) দেখে ওষুধ দেওয়া হয় না। এর কারণসমূহ:
  • লক্ষণই প্রধান গাইড: ওষুধের পরীক্ষণে মানুষের শরীরে যে সমস্ত মানসিক ও শারীরিক লক্ষণ পাওয়া গেছে, রোগীর লক্ষণের সাথে তা হুবহু মেলানো হয়।
  • ব্যক্তিভেদে আলাদা ওষুধ: একই রোগে আক্রান্ত তিনজন রোগীর লক্ষণ ভিন্ন হলে ওষুধও ভিন্ন হবে।
  • মূল উৎপাটন: লক্ষণ সমষ্টির ওপর ভিত্তি করে ওষুধ দিলে তা সরাসরি জীবনী শক্তির ওপর কাজ করে রোগকে গোড়া থেকে নির্মূল করে। তাই একে সম্পূর্ণভাবে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা বলা হয়।
৫। প্রশ্নাবলী:
ক) 'হোমিওপ্যাথিতে রোগ নয় রোগীর চিকিৎসা করা হয়'—ব্যাখ্যা কর।
এটি হোমিওপ্যাথির অন্যতম প্রধান ও মৌলিক নীতি। প্রচলিত চিকিৎসায় রোগের নাম অনুযায়ী সবার জন্য একই ওষুধ দেওয়া হয় (যেমন: সবার মাথাব্যথার জন্য একই পেইনকিলার)। কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে মানুষের সামগ্রিক সত্ত্বাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রত্যেক মানুষের শারীরিক গঠন, মানসিক অবস্থা, বংশগত ধারা এবং জীবনযাপন ভিন্ন। তাই রোগাক্রান্ত অঙ্গটির চিকিৎসা না করে, কেন পুরো মানুষটির জীবনী শক্তি দুর্বল হলো, তার মানসিক অবস্থা কেমন, সে শীতকাতর নাকিাতর—সবকিছু বিচার করে ওষুধ দেওয়া হয়। রোগীকে সুস্থ করে তুললে রোগ এমনিতেই চলে যায়, তাই বলা হয় রোগ নয়, রোগীর চিকিৎসা করা হয়।
খ) একজন উত্তম ওষুধ পরীক্ষকের বর্ণনা দাও।
হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা সমৃদ্ধ করার জন্য ওষুধের সঠিক পরীক্ষণ (Drug Proving) প্রয়োজন। একজন উত্তম ওষুধ পরীক্ষকের (Prover) মধ্যে নিম্নোক্ত গুণাবলী থাকা চাই:
  • সম্পূর্ণ সুস্থ শরীর ও মন: পরীক্ষককে অবশ্যই শারীরিকভাবে সুস্থ এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে অন্য কোনো রোগের লক্ষণ ওষুধের লক্ষণের সাথে মিশে না যায়।
  • সচেতন ও সত্যবাদী: তিনি হবেন কুসংস্কারমুক্ত, বুদ্ধিমান এবং নিজের শরীরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো সঠিকভাবে খেয়াল করে সত্য ও নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম।
  • নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন: পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তিনি কোনো মাদক, অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার বা অন্য কোনো তীব্র উদ্দীপক খাবার গ্রহণ করবেন না।
গ) ঔষধ ও রোগের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা নির্ণয় কর।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকরণ (Individualization) হলো প্রকৃতির একটি নিয়ম। দুনিয়ার কোনো দুটি জিনিস হুবহু এক নয়।
  • রোগের ক্ষেত্রে: একই আমাশয় রোগে আক্রান্ত দুজন মানুষের কষ্ট এক হতে পারে না। একজন হয়তো গরমে আরাম পায়, অন্যজন ঠান্ডায়। একজনের মেজাজ খিটখিটে হয়, অন্যজন শান্ত থাকে। এটাই রোগের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতা।
  • ওষুধের ক্ষেত্রে: একইভাবে প্রতিটি ওষুধের নিজস্ব স্বতন্ত্র চরিত্র রয়েছে। যেমন: 'একোনাইট' এবং 'বেলেডোনা' দুটিই তীব্র জ্বরে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু একোনাইটের প্রধান লক্ষণ মৃত্যুভয় ও ছটফটানি, আর বেলেডোনার লক্ষণ মুখ লাল হওয়া ও নিস্তেজ ভাব। এই স্বাতন্ত্র্যতা বুঝেই সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়।
৬। প্রশ্নাবলী:
ক) হোমিওপ্যাথির মাত্রাতত্ত্ব সম্বন্ধে বর্ণনা কর।
হোমিয়োপ্যাথিতে মাত্রাতত্ত্ব (Doctrine of Dose) অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ডা. হ্যানিম্যান ওষুধের স্থূল বা বড় মাত্রা প্রয়োগের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। মাত্রাতত্ত্বের মূল কথা হলো রোগীকে ওষুধ দিতে হবে ন্যূনতম মাত্রায় (Minimum Dose)। ওষুধকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় (পোটেনটাইজেশন) ঝাঁকি বা ঘর্ষণের মাধ্যমে এর ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা হয় এবং তা তরল বা গ্লোবিউলসের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আকারে রোগীকে দেওয়া হয়, যা জীবনী শক্তিকে উদ্দীপিত করে রোগ আরোগ্য করে।
খ) "সূক্ষ্মমাত্রা অধিক কার্যকর"—ব্যাখ্যা কর।
হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যত বেশি পাতলা বা সূক্ষ্ম (Diluted) করা হয়, তার আরোগ্যকারী ক্ষমতা বা গতিশীল শক্তি তত বৃদ্ধি পায়।
  • কারণ ১: মানুষের জীবনী শক্তি একটি অদৃশ্য সূক্ষ্ম শক্তি। একে উদ্দীপিত করতে স্থূল জড় পদার্থের চেয়ে সূক্ষ্ম বা ডাইনামিক শক্তির ওষুধ বেশি দ্রুত ও সহজে কাজ করে।
  • কারণ ২: সূক্ষ্মমাত্রা দিলে ওষুধের কোনো নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া শরীরে তৈরি হয় না। এটি কেবল শরীরের প্রাকৃতিক নিরাময় ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলে, ফলে আরোগ্য হয় দ্রুত ও স্থায়ী।
গ) হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় রোগীর ধাতুগত বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে লিখ।
ধাতুগত বৈশিষ্ট্য বা কনস্টিটিউশন (Constitution) বলতে রোগীর শারীরিক গঠন, মানসিক প্রবণতা, বংশগত প্রভাব এবং পরিবেশের প্রতি তার সংবেদনশীলতার সামগ্রিক রূপকে বোঝায়। যেমন—কেউ রোগা ও লম্বা (ফসফরাস ধাতু), কেউ মোটা ও ফর্সা (ক্যালকেরিয়া কার্ব ধাতু)। কেউ সামান্য ঠান্ডাতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে (শীতকাতর), কেউ গরম সহ্য করতে পারে না (গরমকাতর)। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় স্থায়ী আরোগ্যের জন্য (বিশেষ করে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী রোগে) রোগীর এই ধাতুগত বৈশিষ্ট্য চেনা এবং সেই অনুযায়ী ওষুধ নির্বাচন করা অপরিহার্য।
৭। প্রশ্নাবলী:
ক) নীতি ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কর।
নীতি এবং মতামতের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
বিষয় নীতি (Principle) মতামত (Opinion)
সংজ্ঞা নীতি হলো চিরন্তন সত্য ও প্রমাণিত নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মতামত হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব ধারণা বা বিশ্বাস।
পরিবর্তনশীলতা এটি অপরিবর্তনশীল এবং সার্বজনীন। সময়, কাল ও ব্যক্তিভেদে এটি পরিবর্তিত হতে পারে।
উদাহরণ যেমন: 'সদৃশ আরোগ্য নীতি' একটি চিরন্তন নীতি। কারো মতে উচ্চ শক্তি ভালো, কারো মতে নিম্ন শক্তি ভালো—এটি মতামত।
খ) হোমিওপ্যাথিটিকে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা বলা হয় কেন?
(দ্রষ্টব্য: এই প্রশ্নটি ৪-এর 'গ' প্রশ্নের সম্পূর্ণ অনুরূপ। বিস্তারিত উত্তরের জন্য ৪(গ) অংশটি দ্রষ্টব্য।)
গ) হোমিওপ্যাথিতে মানসিক লক্ষণের গুরুত্ব লিখ।
হোমিওপ্যাথিক দর্শনে শারীরিক লক্ষণের চেয়ে মানসিক লক্ষণের (Mental Symptoms) মূল্য অনেক বেশি। ডা. হ্যানিম্যান বলেছেন, মনই হলো মানুষের আসল কেন্দ্রবিন্দু।
  • সর্বোচ্চ গ্রেড: ওষুধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে রোগীর ইচ্ছা, অনিচ্ছা, রাগ, ভয়, হিংসা, শোক বা বিষণ্ণতাকে প্রথম শ্রেণির লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
  • রোগের উৎস: অনেক সময় মানসিক আঘাত (যেমন: প্রেমে ব্যর্থতা, ব্যবসায়ে ক্ষতি বা প্রিয়জন হারানোর শোক) থেকে বড় বড় শারীরিক রোগের উৎপত্তি হয়। মানসিক লক্ষণ ধরে ওষুধ দিলে শারীরিক রোগ দ্রুত দূর হয়।
৮। সংক্ষেপে লিখ (টীকা):
ক) হোমিওপ্যাথি
জার্মান চিকিৎসক ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান ১৭৯৬ সালে 'সদৃশ বিধান' বা 'Similia Similibus Curentur' নীতির ওপর ভিত্তি করে যে চিকিৎসা বিজ্ঞান আবিষ্কার করেন, তাকেই হোমিওপ্যাথি বলে। এটি প্রাকৃতিক, মৃদু, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং সমগ্র মানুষটির (শারীরিক ও মানসিক) আরোগ্যকারী একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
খ) ব্যবস্থাপত্র
ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন হলো একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের দ্বারা রোগীকে দেওয়া একটি লিখিত নির্দেশনাবলী। এতে রোগীর নাম, বয়স, বিস্তারিত লক্ষণ সংগ্রহ (Case Taking) শেষে নির্বাচিত সঠিক ওষুধের নাম, শক্তি, মাত্রা, সেবনের নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় পথ্য ও আনুষঙ্গিক উপদেশের উল্লেখ থাকে।
গ) তরুণ রোগ
যে সমস্ত রোগ হঠাৎ করে তীব্রভাবে আক্রমণ করে এবং দ্রুত একটি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় (হয় রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে, না হয় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে), তাকে তরুণ রোগ বা Acute Disease বলে। যেমন: আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে সর্দি-জ্বর, কলেরা, ডায়রিয়া ইত্যাদি। এর স্থায়িত্বকাল সাধারণত কম হয়।
ঘ) রেমেডি
হোমিওপ্যাথিতে 'মেডিসিন' বা ওষুধের চেয়ে 'রেমেডি' (Remedy) শব্দটি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ উৎস থেকে প্রাপ্ত উপাদান যখন প্রুভিং ও পোটেনটাইজেশনের মাধ্যমে আরোগ্যকারী ক্ষমতাসম্পন্ন ডাইনামিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং রোগীর সদৃশ লক্ষণ অনুযায়ী আরোগ্যের জন্য নির্বাচিত হয়, তখন তাকে রেমেডি বা আরোগ্যকারী উপায় বলা হয়।
ঙ) হ্রাস-বৃদ্ধি
হ্রাস-বৃদ্ধি বা Modalities হলো হোমিওপ্যাথির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগত লক্ষণ। কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে রোগীর কষ্ট বা রোগের তীব্রতা বাড়ে (বৃদ্ধি) এবং কিসে কমে (হ্রাস), তাকেই হ্রাস-বৃদ্ধি বলে। যেমন: আর্সেনিক অ্যালবামের রোগ লক্ষণ মধ্যরাতে বাড়ে (বৃদ্ধি) এবং গরম সেঁক দিলে উপশম হয় (হ্রাস)। সঠিক ওষুধ চেনার জন্য এটি অত্যন্ত সহায়ক।

Post a Comment

Previous Post Next Post