ডিএইচএমএস (DHMS) ১ম বর্ষ পরীক্ষা - ২০২৬
মেটেরিয়া মেডিকা (Materia Medica)
বিগত বছরের পরীক্ষায় আসা প্রশ্ন ও সহজ সমাধান
ঔষধ কী: যে সমস্ত ভেষজ বা উপাদান নির্দিষ্ট নিয়ম ও ফার্মাকোপিয়া অনুযায়ী প্রস্তুত করার পর সুস্থ মানবদেহে প্রুভিং বা পরীক্ষা করলে রোগসদৃশ লক্ষণ তৈরি করতে পারে এবং যা প্রাকৃতিক রোগশক্তিকে দূর করে রোগীকে আরোগ্য করতে পারে, তাকে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বলে।
১০টি হোমিওপ্যাথিক ঔষধের পূর্ণ নাম:
- Aconitum Napellus (একোনাইট ন্যাপ)
- Belladonna (বেলেডোনা)
- Bryonia Alba (ব্রায়োনিয়া এলবা)
- Arsenicum Album (আর্সেনিক অ্যালবাম)
- Chamomilla (ক্যামোমিলা)
- Nux Vomica (নাক্স ভমিকা)
- Rhus Toxicodendron (রাস টক্স)
- Cinchona Officinalis / China (চায়না)
- Ipecacuanha (ইপিকাক)
- Antimonium Tartaricum (এন্টিম টার্ট)
মেটেরিয়া মেডিকা: চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে শাখায় ঔষধের নাম, উৎস, পরিচয়, রাসায়নিক বা ভেষজ গুণাগুণ, সুস্থ মানবদেহে তার কার্যকারিতার পরীক্ষা (Proving) এবং রোগ আরোগ্যের লক্ষণাবলি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকে মেটেরিয়া মেডিকা বলে।
পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা: লক্ষণ সাদৃশ্যে সঠিক ঔষধ নির্বাচন করতে এর জ্ঞান অপরিহার্য। ঔষধের হ্রাস-বৃদ্ধি ও ক্রিয়াকাল জেনে সঠিক শক্তিমাত্রা প্রয়োগ করতে এটি সাহায্য করে।
শ্রেণিবিন্যাস:
- বিশুদ্ধ মেটেরিয়া মেডিকা: যেখানে কেবল মানবদেহে পরীক্ষিত বাস্তব লক্ষণ থাকে। যেমন: Hahnemann's Materia Medica Pura।
- ক্লিনিক্যাল মেটেরিয়া মেডিকা: প্রুভিং লক্ষণের সাথে চিকিৎসকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বা আরোগ্যকারী লক্ষণ যুক্ত থাকে। যেমন: Clarke's Clinical Materia Medica।
মৌলিক গ্রন্থ বলার কারণ: হোমিওপ্যাথির প্রধান মূলনীতি হলো 'সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে'। রোগীর দেহে যে লক্ষণ সমষ্টি থাকে, ঠিক সেই লক্ষণ সৃষ্টিকারী ঔষধটি খুঁজে পেতে হয়। ঔষধসমূহের এই সমস্ত প্রমাণিত ও বিশুদ্ধ লক্ষণ মেটেরিয়া মেডিকাতে লিপিবদ্ধ থাকে বিধায় একে হোমিওপ্যাথির মৌলিক গ্রন্থ বা ভিত্তি বলা হয়।
ব্যাখ্যা: একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ের চেয়ে রোগীর লক্ষণ সংগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেন। সংগৃহীত লক্ষণের সাথে ঔষধের লক্ষণের তুলনা না করতে পারলে সঠিক সদৃশ ঔষধ নির্বাচন অসম্ভব। মেটেরিয়া মেডিকার জ্ঞান না থাকলে ভুল ঔষধ নির্বাচন হবে এবং চিকিৎসা ব্যর্থ হবে। তাই মেটেরিয়া মেডিকা ব্যতীত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অসম্ভব।
হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রধানত ৬টি উৎস থেকে প্রস্তুত করা হয়:
- উদ্ভিজ উৎস (Vegetable Kingdom): বিভিন্ন গাছপালা, লতাগুল্মের রস, মূল বা পাতা থেকে। যেমন: Aconite, Bryonia, Pulsatilla।
- খনিজ উৎস (Mineral Kingdom): বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, ধাতু, অধাতু ও রাসায়নিক যৌগ থেকে। যেমন: Sulphur, Arsenic Album, Calcarea Carb।
- প্রাণীজ উৎস (Animal Kingdom): জীবন্ত বা মৃত প্রাণী এবং প্রাণীর বিষ বা ত্যাজ্য পদার্থ থেকে। যেমন: Apis Mellifica (মৌমাছি), Lachesis (সাপের বিষ)।
- নোজোডস (Nosodes): রোগাক্রান্ত মানব বা জীবদেহ থেকে প্রাপ্ত পুঁজ, রক্ত, রস বা জীবাণু থেকে প্রস্তুত। যেমন: Psorinum, Medorrhinum।
- সারকোডস (Sarcodes): সুস্থ প্রাণীর দেহযন্ত্র বা গ্রন্থির রস ও হরমোন থেকে প্রস্তুত। যেমন: Thyroidinum।
- ইমপন্ডারবিলিয়া (Imponderabilia): প্রাকৃতিক বা অদৃশ্য শক্তি (যেমন আলো, চৌম্বক শক্তি) ব্যবহার করে প্রস্তুত। যেমন: Magnetis, X-Ray।
| বিষয় | হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা | অ্যালোপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা |
|---|---|---|
| পরীক্ষণ (Proving) | সুস্থ মানবদেহে ঔষধ পরীক্ষা করে লক্ষণ তৈরি ও লিপিবদ্ধ করা হয়। | পশু-পাখি বা ল্যাবরেটরির ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে তৈরি করা হয়। |
| লক্ষণ প্রাধান্য | মানসিক ও শারীরিক উভয় প্রকার সূক্ষ্ম লক্ষণকে প্রধান ধরা হয়। | কেবলমাত্র প্যাথলজিক্যাল ও শারীরিক স্থূল পরিবর্তনকে দেখা হয়। |
| প্রয়োগ নীতি | সদৃশ বিধান বা লক্ষণ সাদৃশ্যের ভিত্তিতে একক ঔষধ প্রয়োগের নীতি। | বিপরীত বিধান বা রোগের বিপরীত ক্রিয়াশীল মিশ্র ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। |
উৎস: উদ্ভিজ (Aconitum Napellus নামক গাছের মূল ও পাতা)।
ক্রিয়াস্থল: রক্তসঞ্চালন তন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং শ্লৈষ্মিক ঝিল্লী।
চরিত্রগত লক্ষণ:
- আকস্মিকতা ও প্রবলতা: রোগ হঠাৎ খুব তীব্রভাবে আক্রমণ করে।
- মৃত্যুভয় ও অস্থিরতা: রোগী মৃত্যুর ভয়ে অত্যন্ত আতঙ্কিত থাকে, ছটফট করে এবং এমনকি মৃত্যুর সময় বা দিনক্ষণ ঘোষণা করে।
- কারণ: ঠাণ্ডা ও শুষ্ক বাতাস লাগার ফলে রোগের উৎপত্তি।
- হ্রাস-বৃদ্ধি: রাতে এবং গরম ঘরে রোগ বৃদ্ধি পায়; খোলা বাতাসে এবং বিশ্রামে উপশম হয়।
উৎস: উদ্ভিজ (Fool's Parsley বা বুনো ধনে পাতা)।
চারিত্রিক লক্ষণ: দুধ পানে সম্পূর্ণ অনিচ্ছা বা দুধ একেবারেই সহ্য করতে না পারা এর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। রোগী অত্যন্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং মুখমণ্ডলে একটা যন্ত্রণার ছাপ দেখা যায়। এতে কোনো পিপাসা থাকে না।
শিশু উদরাময় ও বমি: শিশু দুধ পান করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র বেগে ছানার মতো জমাট বাঁধা দুধ বমি করে দেয়। বমি বা মলত্যাগের পরেই শিশু অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে। মলে অজীর্ণ খাদ্যকণা থাকে এবং মল সবুজ বা হলদে রঙের জলের মতো হয়।
হ্রাস-বৃদ্ধি: দুধ পানের পর, গরমে ও সকালে বৃদ্ধি; খোলা বাতাসে ও বিশ্রামে উপশম।
চরিত্রগত লক্ষণ ও শিশুচিত্র: ক্যামোমিলার রোগী বা শিশু অত্যন্ত খিটখিটে, রাগী ও অবাধ্য হয়। শিশু অনবরত কান্নাকাটি করে এবং কোলে নিয়ে পায়চারি করলে শান্ত থাকে। কোনো জিনিস পাওয়ার জন্য জেদ ধরে, কিন্তু জিনিসটি দিলে তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। শিশুর একটি গাল লাল এবং অন্য গালটি ফ্যাকাশে বা ঠাণ্ডা থাকে।
প্রসব বেদনা: প্রসব বেদনা অত্যন্ত তীব্র ও অসহ্য হয়। যন্ত্রণায় প্রসূতি খিটখিটে হয়ে পড়ে, চিৎকার করে এবং বলে যে সে এই কষ্ট সহ্য করতে পারছে না।
কর্ণের পীড়া: কানে তীব্র কান্নার মতো ব্যথা হয়। ঠাণ্ডা লাগার কারণে বা দাঁত উঠার সময়ে কানে যে ব্যথা হয়, তাতে শিশু ছটফট করলে এটি অনন্য ঔষধ।
উৎস: উদ্ভিজ (ঘৃতকুমারী বা Aloe vera জাতীয় গাছের পাতার ঘন রস)।
ক্রিয়াস্থল: নিচের অন্ত্র (Rectum), যকৃত ও পোর্টাল রক্তসঞ্চালন তন্ত্র।
নির্দেশক ও আমাশয়ের লক্ষণ:
- মলদ্বারের পেশীর শিথিলতা এর প্রধান লক্ষণ। মলত্যাগের বেগ আসলে রোগী এক মুহূর্তও মল চেপে রাখতে পারে না, দ্রুত পায়খানায় দৌড়াতে হয় (Urgent stool)।
- বায়ুত্যাগ করতে গেলে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু মল বা আম বেরিয়ে পড়ে।
- আমাশয়ের ক্ষেত্রে মলে প্রচুর পরিমাণে জেলির মতো আম বা শ্লেষ্মা থাকে। মলত্যাগের আগে ও পরে পেটে তীব্র মোচড়ানি ব্যথা হয়।
প্রভার ও ক্রিয়াস্থল: ড. সেন্টেন (Dr. Central / ড. হেরিঙের সহকর্মী)। এর প্রধান ক্রিয়াস্থল ত্বক, সেলুলার টিস্যু, মূত্রতন্ত্র এবং চোখ।
নির্দেশক লক্ষণ ও মূত্রতন্ত্রের উপর ক্রিয়া:
- শরীরের বিভিন্ন স্থানে শোথ বা ফোলা ভাব (Edema/Dropsy) তৈরি হওয়া। ফোলা স্থানটি মৌমাছি হুল ফোটানোর মতো লাল ও চকচকে দেখায়।
- রোগীর সমস্ত যন্ত্রণায় হুল ফোটানোর মতো তীব্র বেদনা (Stinging pain) থাকে।
- মূত্রতন্ত্রের উপর ক্রিয়ায় প্রস্রাবের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। প্রস্রাব করার সময় তীব্র জ্বালাপোড়া ও যন্ত্রণা হয়।
- রোগী সম্পূর্ণ পিপাসাহীন (Thirstless) এবং গরমকাতর হয়। গরম প্রয়োগে কষ্ট বাড়ে, ঠাণ্ডা জলে আরাম পায়।
উৎস: উদ্ভিজ (আমাদের পরিচিত লাল পেঁয়াজ)।
অনুপূরক ঔষধ ও হ্রাস-বৃদ্ধি: ফসফরাস, পালসেটিলা ও থুজা। সন্ধ্যায় এবং গরম ঘরে রোগ বৃদ্ধি পায়; খোলা ও ঠাণ্ডা বাতাসে উপশম হয়।
সর্দি ও নাকের পলিপের লক্ষণ:
- নাক থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় ও তীব্র ঝাঁঝালো (Acrid) সর্দি নিঃসৃত হয়, যা নাকের চারপাশের চামড়া ছিলে ফেলে বা লাল করে দেয়।
- চোখ থেকেও জল পড়ে, তবে চোখের জল হয় অনভিষ্যন্দী বা ঠাণ্ডা (Bland), যা চোখে জ্বালা তৈরি করে না (ইউফ্রেসিয়ার উল্টো)।
- নাকের পলিপ বা সর্দির কারণে অনবরত হাঁচি হয় এবং রোগী গরম ঘরে গেলে কষ্ট বাড়ে।
উৎস ও প্রভার: উদ্ভিজ (May Apple বা আমেরিকান মান্দার গাছের মূল)। প্রভার: ড. উইলিয়ামসন।
ক্রিয়াস্থল ও নির্দেশক লক্ষণ: যকৃত, ক্ষুদ্রান্ত্র ও মলদ্বার। এর প্রধান লক্ষণ হলো অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত ও প্রচুর পরিমাণে মলত্যাগ করা।
উদরাময় ও যকৃতের পীড়া:
- মল অত্যন্ত জলো, পীত বা হলদে রঙের এবং কামড়ানি ছাড়াই প্রচুর পরিমাণে নির্গত হয়, যা পুরো কমোড বা পাত্র ভরিয়ে ফেলে (Profuse, gushing stool)।
- মলত্যাগের পর রোগী অত্যন্ত দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মলে তীব্র পচা বা দুর্গন্ধ থাকে।
- যকৃতের পীড়ায় ডান দিকে ভারী ভাব এবং জন্ডিসের লক্ষণ দেখা যায়। মলত্যাগের সাথে সাথে অনেক সময় মলদ্বার বাইরে বেরিয়ে আসে (Prolapsus ani)।
প্রতিনাম ও সংকেত: শ্বেত সংখ্যা বা Arsenious Acid। রাসায়নিক সংকেত: As2O3।
নির্দেশক ও মানসিক লক্ষণ: চরম মানসিক ও শারীরিক অস্থিরতা। রোগী মৃত্যুর ভয়ে আতঙ্কিত থাকে। শরীরের যেকোনো স্থানে তীব্র জ্বালাকর বেদনা (Burning pain) হয়, তবে অদ্ভুত বিষয় হলো গরম প্রয়োগে বা গরমে আরাম বোধ করে। অল্প অল্প করে বারবার জল পান করে। মধ্যরাতে এবং মধ্যদিবসে রোগ বৃদ্ধি পায়।
কলেরায় ব্যবহার: কলেরার চরম অবস্থায় যখন রোগীর মল ও বমি একসাথে হতে থাকে, শরীর বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যায়, রোগী চরম অবসন্ন ও নীল বর্ণ ধারণ করে এবং অল্প অল্প করে জল পানের তীব্র পিপাসা থাকে, তখন এটি একটি অমোঘ ঔষধ।
প্রতিনাম ও প্রাপ্তিস্থান: জয়পাল (Croton Oil Seed)। এটি মূলত ভারত ও পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (উদরাময়): মলত্যাগের বেগ আসার পর খাওয়া বা পান করার সাথে সাথেই মল তরল আকারে সজোরে বা বন্দুকের গুলির মতো পিচকারি দিয়ে ছিটকে নির্গত হয় (Shot out of a gun)। মলত্যাগের পর তীব্র তলপেটে মোচড়ানি ও দুর্বলতা থাকে।
হ্রাস-বৃদ্ধি: সামান্য কিছু আহার বা পান করলে এবং নড়াচড়া করলে বৃদ্ধি; বিশ্রামে উপশম।
সিনার রোগীচিত্র: সিনার শিশু অত্যন্ত খিটখিটে, রাগী এবং ক্রন্দনশীল। সে কাউকে তার দিকে তাকাতে বা তাকে স্পর্শ করতে দেয় না। শিশু ঘুমের মধ্যে চমকে ওঠে, দাঁত কিড়মিড় করে এবং অনবরত আঙুল দিয়ে নাক চুলকায় বা খোঁটে। চোখের চারপাশে কালো দাগ দেখা যায় এবং ক্ষুধা খুব বেশি থাকে।
কৃমিতে ব্যবহার: শিশুদের পেটে সুতা কৃমি বা গোল কৃমি হলে এবং তার ফলে পেটে ব্যথা, রাতে বিছানায় প্রস্রাব করা, নাক চুলকানো এবং খিটখিটে মেজাজ তৈরি হলে সিনা তার শ্রেষ্ঠ আরোগ্যকারী ঔষধ।
ক্রিয়াস্থল ও ধাতুগত লক্ষণ: ফুসফুস ও স্নায়ুতন্ত্র। রোগী অলস, ফ্যাকাশে, শরীরে মেদযুক্ত এবং সাধারণত শীতকাতর হয়। এর রোগীরা সহজে খিটখিটে হয়ে পড়ে এবং ছোঁয়া পছন্দ করে না।
শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ (Respiratory):
- ফুসফুস বা বুকে প্রচুর পরিমাণে শ্লেষ্মা বা কফ জমা হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় বুকে ঘড়ঘড় শব্দ (Rattling of mucus) স্পষ্ট শোনা যায়।
- বুকে এত কফ জমে যে মনে হয় কাশির সাথে সব কফ উঠে আসবে, কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো খুব সামান্য কফই বাইরে নির্গত হয়।
- কফ তুলতে না পেরে দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়, মুখমণ্ডল নীলচে বা ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং রোগী উঠে বসতে বাধ্য হয়।
অনুপূরক ঔষধ: বেরাইটা কার্ব, ক্যাম্পফর, ইপিকাক।
প্রভার ও উৎস: মহাত্মা ড. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। উৎস: উদ্ভিজ (Bryonia Alba নামক শ্বেত পিয়ালু গাছের মূল)।
ক্রিয়াস্থল ও হ্রাস-বৃদ্ধি: শরীরের সমস্ত শ্লৈষ্মিক ঝিল্লী, ফুসফুসের আবরণী (Pleura) এবং জয়েন্ট বা সন্ধিস্থল। সামান্য নড়াচড়াতে বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ বিশ্রামে ও ব্যথার দিকে চেপে শুলে উপশম।
জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ:
- ব্রায়োনিয়াকে ধীরগতির ঔষধ বলা হয় কারণ এর রোগ ধীরে ধীরে শরীরে প্রকাশ পায়।
- জ্বরে রোগীর মুখ, ঠোঁট, গলা অত্যন্ত শুকিয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় পর পর প্রচুর পরিমাণে ঠাণ্ডা জল পান করার তীব্র পিপাসা থাকে।
- শ্বাসতন্ত্রে বা কাশিতে শুষ্ক, খটখটে কাশি হয়। কাশির সময় বুকে তীব্র সূচ ফোটানোর মতো ব্যথা হয়, তাই রোগী কাশির সময় বুক হাত দিয়ে চেপে ধরে যাতে নড়াচড়া কম হয়।
উৎস: উদ্ভিজ (Nux Vomica বা কুচিলা গাছের বীজ)।
চারিত্রিক ও পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণ:
- আধুনিক ও বিলাসী জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রম, মাদক বা মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া এবং রাত জাগার কারণে সৃষ্ট রোগে এটি প্রধান ঔষধ।
- অসম্পূর্ণ মলত্যাগের বেগ: রোগী বারবার মলত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু পরিষ্কারভাবে মলত্যাগ হয় না। মলত্যাগের পর মনে হয় আরও কিছুটা মল রয়ে গেছে (Ineffectual desire for stool)।
- রোগী অত্যন্ত খিটখিটে মেজাজের, ঝগড়ুটে এবং ভীষণ শীতকাতর হয়।
ক্রিয়াস্থল: রক্ত, লিভার, প্লিহা ও পরিপাকতন্ত্র।
প্রয়োগক্ষেত্রসমূহ:
- দুর্বলতা: শরীর থেকে কোনো তরল পদার্থ বা খনিজ যেমন—অতিরিক্ত রক্তস্রাব, বীর্যক্ষয়, ডায়রিয়া বা অতিরিক্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর ফলে শরীর নিস্তেজ ও দুর্বল হয়ে পড়লে চায়না তার প্রধান ঔষধ।
- পরিপাকতন্ত্র: পুরো পেট গ্যাসে ঢোল হয়ে ফুলে থাকে (Flatulence)। সমস্ত পেট পূর্ণ মনে হয়, অথচ আহার করলে কোনো উপশম হয় না। বায়ু বা ঢেঁকুর ত্যাগ করলেও পেটের ফাঁপা কমে না।
- রক্তস্রাব: শরীর থেকে কালো ও জমাট বাঁধা রক্ত নির্গত হওয়ার কারণে মাথায় ঝিমঝিম করা, কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হওয়া ও মূর্ছা যাওয়ার লক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
উৎস ও প্রভার: উদ্ভিজ (Ipecacuanha নামক গাছের মূল)। প্রভার: ড. হ্যানিম্যান।
ক্রিয়াস্থল ও বমির লক্ষণ: ভেগাস স্নায়ু ও পাকস্থলী। ইপিকাকের প্রধান কথা হলো—অনবরত বমি বমি ভাব (Persistent Nausea)। বমি করার পরেও বমির ভাব কমে না। জিহ্বা সর্বদা পরিষ্কার ও লাল থাকে (Clean tongue), কোনো প্রলেপ থাকে না এবং মুখে থুতু বা লালা বেশি জমে, পিপাসাহীনতা থাকে।
শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ: দম আটকানো শুকনো কাশি। কাশির সাথে বমি বমি ভাব বা বমি হয়ে যায়। বুকে শ্লেষ্মার ঘড়ঘড় শব্দ হয় কিন্তু কফ সহজে ওঠে না। শিশুদের হপিং কাশিতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
নির্দেশক লক্ষণ: প্রতিটি রোগের আক্রমণ হঠাৎ আসে এবং হঠাৎ চলে যায়। আক্রান্ত স্থান অত্যন্ত লাল, গরম এবং চকচকে হয়ে ওঠে (Redness, Heat, and Throbbing)। চোখের মণি প্রসারিত থাকে এবং মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করে।
মাথা ব্যথা: মাথায় দপদপানি ব্যথা (Throbbing headache) হয়, মনে হয় রক্ত সব মাথায় এসে জমা হয়েছে। আলো, শব্দ, সামান্য নড়াচড়া বা ঝাঁকুনি লাগলে ব্যথা চরম আকার ধারণ করে। মাথা শক্ত করে বাঁধলে বা অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকলে কিছুটা আরাম বোধ হয়।
মাথাব্যথা (Sun-stroke/Headache): রোদের উত্তাপ লাগার কারণে সৃষ্ট তীব্র মাথাব্যথায় এটি প্রধান ঔষধ। মাথায় প্রচণ্ড দপদপানি ব্যথা হয়, মনে হয় মাথার খুলি ফেটে যাবে। রোগী হৃদস্পন্দনের আওয়াজ মাথায় অনুভব করতে পারে।
রক্তচাপ (High Blood Pressure): হঠাৎ রক্তচাপ বৃদ্ধি পেয়ে মাথায় রক্ত উঠে যাওয়া, মুখ লাল হয়ে যাওয়া এবং নাড়ির গতি অত্যন্ত শক্ত ও দ্রুত হলে গ্লোনইন রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে দ্রুত কাজ করে।
উৎস ও ক্রিয়াস্থল: উদ্ভিজ (Leopard's Bane নামক গাছের মূল)। প্রধান ক্রিয়াস্থল রক্তকৈশিক ঝিল্লী, পেশী এবং ত্বক।
আঘাতজনিত পীড়া: যেকোনো ধরনের ভোঁতা বা থ্যাঁতলানো আঘাত (Blunt injury), পড়ে যাওয়া বা মচকানোর কারণে সৃষ্ট ব্যথায় আর্নিকা প্রধান ঔষধ। রোগী মনে করে তার সারা শরীর কেউ লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে (Bruised feeling)। আক্রান্ত স্থান কালো-নীল হয়ে পড়ে।
টাইফয়েড জ্বর: জ্বরের ঘোরে রোগী অচেতনাবস্থায় থাকে। কেউ প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর দিয়ে আবার ঘুমে ঢলে পড়ে। বিছানা অত্যন্ত শক্ত মনে হয়, তাই রোগী অনবরত এপাশ-ওপাশ করে আরাম খোঁজে। তার নিঃশ্বাস, মল ও ঘাম অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়।
চারিত্রিক লক্ষণ ও শোথ (Dropsy): হৃদপিণ্ড বা যকৃতের দুর্বলতার কারণে শরীর ফুলে যাওয়া বা শোথ রোগে এটি অত্যন্ত কার্যকরী। শরীর জল জমে ফুলে যায়। এর প্রধান লক্ষণ হলো—রোগীর প্রচুর পরিমাণে জল পানের তীব্র পিপাসা থাকে, কিন্তু জল পান করার সাথে সাথেই তা বমি হয়ে যায় অথবা পেটে অস্বস্তি তৈরি করে। প্রস্রাবের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
হ্রাস-বৃদ্ধি: ঠাণ্ডা বাতাস ও জল পানের পর বৃদ্ধি; উষ্ণতায় ও প্রস্রাব পরিষ্কার হলে উপশম।
(ক) প্রথম তুলনা:
- এন্টিম ক্রুড: জিহ্বায় দুধের মতো ঘন সাদা প্রলেপ (Thick milk-white coating) থাকে। এটি এর প্রধান পরিচায়ক লক্ষণ।
- ব্রায়োনিয়া: জিহ্বা অত্যন্ত শুষ্ক, খসখসে এবং মাঝখানে সাদা বা হলদেটে প্রলেপ থাকে।
- ইপিকাক: জিহ্বা সম্পূর্ণ পরিষ্কার, লাল এবং লালাযুক্ত থাকে (Clean and moist tongue)।
(খ) দ্বিতীয় তুলনা:
- এন্টিম টার্ট: জিহ্বায় পুরু লালচে-সাদা প্রলেপ থাকে অথবা জিহ্বা শুষ্ক ও মাঝখানে লাল দাগযুক্ত থাকে।
- ইপিকাক: অনবরত বমি ভাব থাকা সত্ত্বেও জিহ্বা পরিষ্কার ও লাল থাকে।
- নাক্স ভমিকা: জিহ্বার পেছনের অংশে হলদে-সাদা প্রলেপ থাকে, সামনের অংশ পরিষ্কার থাকে।
(ক) কোষ্ঠবদ্ধতা (Constipation):
- নাক্স ভমিকা: বারবার মলের বেগ হয় কিন্তু পরিষ্কার হয় না (Ineffectual urging)। মল শক্ত ও অসম্পূর্ণ থাকে।
- চেলিডোনিয়াম: মল মাটির রঙের বা ভেড়ার মলের মতো গোল গোল শক্ত হয়। সাথে ডান স্কন্ধাস্থির নিচে ব্যথা থাকে।
(খ) উদরাময় (Diarrhoea):
- পডোফাইলাম: মল কামড়ানি ছাড়াই অত্যন্ত প্রচুর পরিমাণে, জলো ও সজোরে নির্গত হয়, যা পুরো পাত্র ভরিয়ে ফেলে। তীব্র পচা দুর্গন্ধ থাকে।
- ক্রোটন টিগ্লিয়াম: কিছু আহার বা পান করার সাথে সাথেই মল বন্দুকের গুলির মতো পিচকারি দিয়ে ছিটকে সজোরে বেরিয়ে আসে।
- আর্সেনিক অ্যালবাম: তীব্র পিপাসা থাকে, তবে রোগী অল্প অল্প করে জল বারবার (ঘন ঘন) পান করে।
- একোনাইট ন্যাপ: প্রচুর পরিমাণে ঠাণ্ডা জল একবারে অনেকখানি পান করে এবং জল পানের পরেও পিপাসা মেটে না।
- ব্রায়োনিয়া এলবা: দীর্ঘ সময় পর পর প্রচুর পরিমাণে (এক গ্লাস বা তার বেশি) জল একসাথে পান করে।
(ক) অদ্ভুত লক্ষণ (Peculiar Symptoms): যে সমস্ত লক্ষণ সাধারণ রোগ-লক্ষণ বহির্ভূত এবং কোনো ঔষধের নিজস্ব স্বতন্ত্র রূপ প্রকাশ করে, তাকে অদ্ভুত লক্ষণ বলে। যেমন—আর্সেনিকের জ্বালায় গরম প্রয়োগে আরাম বোধ হওয়া।
(খ) বিরল লক্ষণ (Rare Symptoms): যে সমস্ত লক্ষণ খুব কম রোগীর মধ্যে বা কোনো নির্দিষ্ট ঔষধে দুই-একটি মাত্র দেখা যায়। যেমন—কাশি দিলে পায়ে ব্যথা হওয়া।
(গ) মানসিক আঘাতে ইগ্নেশিয়া (Ignatia in Grief): প্রেমে ব্যর্থতা, প্রিয়জনের মৃত্যু বা আকস্মিক দুঃখ, শোক, ভয় বা অপমানজনিত মানসিক আঘাতের কারণে সৃষ্ট হিক্কা, হিস্টিরিয়া বা অনিদ্রায় ইগ্নেশিয়া হোমিওপ্যাথির প্রধানতম শান্তিদায়ক ঔষধ। এর রোগী দীর্ঘশ্বাস ফেলে (Sighing)।
(ক) ঔষধের তালিকা:
- ৩টি শীতকাতর (Chilly) ঔষধ: Nux Vomica, Arsenic Album, Psorinum।
- ৩টি গরমকাতর (Hot) ঔষধ: Apis Mellifica, Pulsatilla, Sulphur।
(খ) উদরাময়ে ম্যাগনেসিয়া কার্ব (Magnesia Carb): শিশুদের দাঁত উঠার সময়ে সবুজ রঙের টক গন্ধযুক্ত মল নির্গত হলে এটি ব্যবহৃত হয়। মল দেখতে পুকুরের ব্যাঙের ছাতার বা সবুজ শ্যাওলার মতো (Greenish like frog-spawn) দেখায় এবং শিশুর সারা শরীর থেকে টক গন্ধ বের হয়।
Post a Comment