আজকের শিক্ষা ডট কম (ajkershikkha.com)
--:--:--

সর্বশেষ

ডিএইচএমএস প্রথম বর্ষ অর্গানন অব মেডিসিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর।

অর্গানন অফ মেডিসিন সাজেশন ও উত্তর

হোমিওপ্যাথিক ডিএইচএমএস (DHMS) কোর্স - প্রথম বর্ষ

৩য় বিষয়: অর্গানন অব মেডিসিন (Organon of Medicine) এক্সক্লুসিভ সাজেশন্স ও উত্তর

নির্দেশনা: এখানে অর্গানন অব মেডিসিন বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহের ৫ নম্বরের উপযোগী মানসম্মত ও সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি উত্তর পরীক্ষায় সম্পূর্ণ নম্বর পাওয়ার উপযোগী করে সাজানো। পরীক্ষার হলে টেবিলের লেখা যেন কোনোভাবেই কেটে না যায়, তার জন্য বিশেষ সিএসএস লেআউট ব্যবহার করা হয়েছে।

১. 'অর্গানন' (Organon) শব্দের আভিধানিক অর্থ কী? অর্গানন অব মেডিসিন বলতে কী বোঝ?

'অর্গানন' শব্দের আভিধানিক অর্থ: 'অর্গানন' (Organon) একটি গ্রীক শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কাজের বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, মাধ্যম, পদ্ধতি বা চিন্তার হাতিয়ার (An instrument for acquiring knowledge)।

অর্গানন অব মেডিসিন: মহাত্মা হ্যানিম্যান চিকিৎসা বিজ্ঞানকে একটি সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেন, তাকে 'অর্গানন অব মেডিসিন' বলা হয়। এটি হোমিওপ্যাথির মূল দর্শন ও চিকিৎসা পদ্ধতির সংবিধান। এই গ্রন্থে প্রাকৃতিক আরোগ্য নীতির আলোকে ওষুধের কার্যকারিতা, রোগীর লক্ষণ সমষ্টি এবং আদর্শ চিকিৎসকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনিপুণভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সংক্ষেপে, এটি হোমিওপ্যাথির মূল চালিকাশক্তি ও দিকনির্দেশক গ্রন্থ।

২. প্রাথমিক রোগ ও কৃত্রিম রোগ বলতে কী বোঝ?

প্রাথমিক রোগ (Natural Disease): মানবদেহে অদৃশ্য রোগ সৃষ্টিকারী শত্রু বা মায়াজমের প্রভাবে জীবনী শক্তি বিশৃঙ্খল হলে যে রোগ-লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাকে প্রাথমিক রোগ বা প্রাকৃতিক রোগ বলে। এটি প্রকৃতিগতভাবে মানবদেহে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হয়।

কৃত্রিম রোগ (Artificial Disease): সুস্থ মানবদেহে কোনো ভেষজ বা ওষুধ প্রুভিং করার সময় অথবা ভুল চিকিৎসার ফলে ওষুধের প্রভাবে দেহে যে নতুন রোগ-লক্ষণ ও কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তাকে কৃত্রিম রোগ বলে।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মূল নীতি হলো—সদৃশ লক্ষণযুক্ত একটি শক্তিশালী কৃত্রিম রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্বল প্রাকৃতিক বা প্রাথমিক রোগটিকে শরীর থেকে বিতাড়িত করা।

৩. অর্গাননের ৬ষ্ঠ সংস্করণে ডাঃ হ্যানিম্যান কী কী পরিবর্তন করেন?

ডাঃ হ্যানিম্যান তাঁর জীবনের শেষভাগে অর্গানন অব মেডিসিনের ৬ষ্ঠ সংস্করণে যুগান্তকারী কিছু পরিবর্তন আনেন, যা নিম্নরূপ:

  • ৫০ সহস্রতমিক পদ্ধতি (LM Potency): শততমিক পদ্ধতির পরিবর্তে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দ্রুত কার্যকরী ৫০ সহস্রতমিক শক্তির ওষুধের অবতারণা করেন।
  • ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যম: শুষ্ক বড়ির পরিবর্তে ওষুধকে পরিশ্রুত জলে দ্রবীভূত করে ঝাঁকি দিয়ে প্রয়োগের নির্দেশ দেন।
  • ওষুধের মাত্রা ও পুনরাবৃত্তি: রোগীর অবস্থা অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মাত্রা পুনরাবৃত্তির নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেন।
  • জীবনী শক্তির নতুন নামকরণ: পূর্বের সংস্করণের 'Vital Force' শব্দটির পরিবর্তে ৬ষ্ঠ সংস্করণে 'Vital Principle' শব্দটির ব্যবহার করেন।

৪. অসুস্থ অবস্থায় জীবনী শক্তির (Vital Force) ক্রিয়া বর্ণনা কর।

স্বাভাবিক অবস্থায় জীবনী শক্তি মানবদেহকে সুসংহত ও সচল রাখে। কিন্তু যখন কোনো প্রতিকূল বা রোগোৎপাদক অদৃশ্য শক্তি (যেমন: মায়াজম) দ্বারা এই জীবনী শক্তি আক্রান্ত ও বিশৃঙ্খল হয়, তখন তার স্বাভাবিক ক্রিয়া ব্যাহত হয়।

অসুস্থ অবস্থায় জীবনী শক্তির ক্রিয়া নিম্নরূপ:

  • জীবনী শক্তি নিজে অদৃশ্য হওয়ায় তার ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে রোগ-লক্ষণের (Symptoms) মাধ্যমে শরীরের বাহ্যিক অংশে প্রকাশ করে।
  • দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ও মনে অস্বাভাবিক অনুভূতি ও রোগ লক্ষণ সৃষ্টি করে।
  • রোগীর মানসিক ও শারীরিক স্তরে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা চিকিৎসকের কাছে রোগীর রোগ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

৫. প্রাকৃতিক রোগ কীভাবে আরোগ্য সাধন করে? চিকিৎসা তত্ত্ব আলোচনা কর।

প্রকৃতিতে দুটি অসদৃশ রোগ একে অপরকে আরোগ্য করতে পারে না, কিন্তু দুটি সদৃশ রোগ পরস্পরকে ধ্বংস করতে পারে। যখন কোনো মানবদেহে একটি শক্তিশালী সদৃশ প্রাকৃতিক রোগ আক্রমণ করে, তখন তা পূর্বের দুর্বল প্রাকৃতিক রোগটিকে শরীর থেকে সম্পূর্ণ দূর করে দেয়।

চিকিৎসা তত্ত্ব (Therapeutic Law): প্রকৃতির এই চিরন্তন নিয়মকে ভিত্তি করেই হোমিওপ্যাথির মূল চিকিৎসা তত্ত্ব গঠিত হয়েছে—"Similia Similibus Curentur" বা সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য করে। চিকিৎসক যখন রোগীর প্রাকৃতিক রোগের লক্ষণের সাথে হুবহু মিল রেখে একটি শক্তিশালী কৃত্রিম রোগ (সদৃশ ওষুধ) দেহে প্রবেশ করান, তখন সেই কৃত্রিম রোগটি মূল প্রাকৃতিক রোগটিকে স্থানচ্যুত ও ধ্বংস করে এবং পরবর্তীতে ওষুধের প্রভাব কেটে গেলে রোগী পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে।

৬. শক্তির বিশৃঙ্খলা ব্যাখ্যা কর।

মানবদেহ সচল রাখার মূল চালিকাশক্তি হলো 'জীবনী শক্তি' বা Vital Force। এই শক্তি যখন কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ রোগজীবাণু বা মায়াজম দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তার স্বাভাবিক ছন্দ ও গতি হারিয়ে ফেলে। এই ছন্দপতন বা ভারসাম্যহীনতাকেই শক্তির বিশৃঙ্খলা বলা হয়।

শক্তির বিশৃঙ্খলার ফলে দেহে জড় পদার্থের মতো রোগ সৃষ্টি হয় না, বরং সমগ্র দেহ-মন এক অস্বাভাবিক অনুভূতি ও যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়। অর্গানন অনুযায়ী, এই শক্তির বিশৃঙ্খলাই হলো প্রকৃত রোগ। যতক্ষণ না এই আধ্যাত্মিক শক্তির বিশৃঙ্খলা দূর করে একে পুনঃসাম্যাবস্থায় আনা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রোগী সুস্থ হতে পারে না।

৭. উদাহরণসহ রোগের উত্তেজক কারণের (Exciting Cause) সংজ্ঞা দাও।

সংজ্ঞা: যে সমস্ত সাময়িক বা বাহ্যিক কারণে শরীরে সুপ্ত থাকা রোগলক্ষণ হঠাৎ প্রকাশ পায় বা তীব্র রূপ ধারণ করে, তাকে উত্তেজক কারণ বা Exciting Cause বলে। এটি মূলত তরুণ রোগ (Acute Disease) সৃষ্টির জন্য দায়ী।

উদাহরণ:

  • অতিরিক্ত ঠাণ্ডা লাগার ফলে হঠাৎ সর্দি-কাশি বা নিউমোনিয়া হওয়া।
  • পচা বা বাসি খাবার খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া বা ফুড পয়জনিং হওয়া।
  • অতিরিক্ত রৌদ্রে ঘোরাঘুরির ফলে সানস্ট্রোক বা তীব্র মাথাব্যথা হওয়া।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় এই উত্তেজক কারণ দূর করা এবং তাৎক্ষণিক সদৃশ ওষুধ নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি।

৮. প্রকৃত চিররোগ ও মিথ্যা চিররোগের পার্থক্য লিখ।

পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার সুবিধার্থে এবং লেখার স্পষ্টতা বজায় রাখার জন্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে পার্থক্য দেখানো হলো। সিএসএস-এর বিশেষ বিন্যাসের কারণে কোনো লেখা কেটে যাবে না:

তুলনার বিষয় প্রকৃত চিররোগ (True Chronic Disease) মিথ্যা চিররোগ (False Chronic Disease)
উৎস/কারণ এটি অভ্যন্তরীণ মায়াজম (সোরা, সিফিলিস, সাইকোসিস) এর কারণে সৃষ্টি হয়। এটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ত্রুটিপূর্ণ জীবনযাপন বা কুঅভ্যাসের কারণে ঘটে।
প্রকৃতি উপযুক্ত চিকিৎসা ছাড়া এটি নিজে নিজে কখনো ভালো হয় না, ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। উত্তেজক কারণ বা কুঅভ্যাস দূর করলেই এটি নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়।
চিকিৎসা এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী মায়াজমেটিক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সাধারণত কোনো গভীর ওষুধের প্রয়োজন হয় না, নিয়মানুবর্তিতাই প্রধান চিকিৎসা।

৯. আরোগ্য বলতে কী বোঝ? কীভাবে তুমি বুঝবে যে রোগী আরোগ্য লাভ করিয়াছে?

আরোগ্য (Cure): আরোগ্য বলতে কেবল সাময়িকভাবে রোগের কষ্ট দূর হওয়াকে বোঝায় না। আদর্শ আরোগ্য হলো কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া দ্রুত, মৃদু ও স্থায়ীভাবে রোগীর রোগলক্ষণসমূহকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে জীবনী শক্তিকে পূর্বের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।

আরোগ্য লাভের লক্ষণসমূহ: চিকিৎসক যেভাবে বুঝবেন রোগী আরোগ্য লাভ করেছে—

  • রোগীর প্রধান কষ্ট ও আনুষঙ্গিক সকল লক্ষণ সম্পূর্ণ দূরীভূত হবে।
  • রোগীর ক্ষুধা, ঘুম, মলমূত্র ত্যাগ ইত্যাদি প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
  • রোগীর মানসিক প্রফুল্লতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
  • আরোগ্যের দিকটি হেরিং-এর আরোগ্য নীতি (Hering's Law of Cure) অনুসরণ করবে, অর্থাৎ উপর থেকে নিচে এবং ভেতর থেকে বাইরে লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে চলে যাবে।

১০. প্রাকৃতিক রোগ ও কৃত্রিম রোগের মধ্যে পার্থক্য লিখন।

নিচে প্রাকৃতিক রোগ ও কৃত্রিম রোগের মূল পার্থক্যসমূহ টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

তুলনার বিষয় প্রাকৃতিক রোগ (Natural Disease) কৃত্রিম রোগ (Artificial Disease)
উৎপত্তি প্রাকৃতিক কারণে বা মায়াজমের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেহে উৎপন্ন হয়। সুস্থ দেহে ওষুধ প্রুভিং-এর সময় বা অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের ফলে সৃষ্ট।
নিয়ন্ত্রণ ও স্থায়িত্ব এটি সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত এবং সঠিক চিকিৎসা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হয়। এটি চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ওষুধের ক্রিয়া শেষ হলে দূর হয়।
শক্তির তীব্রতা কৃত্রিম রোগের তুলনায় এর শক্তি তুলনামূলকভাবে কম বা দুর্বল। প্রাকৃতিক রোগের চেয়ে কৃত্রিম রোগের শক্তি সর্বদা তীব্র ও শক্তিশালী হয়।

১১. রোগ আরোগ্যের জন্য চিকিৎসকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে লিখ।

অর্গানন অব মেডিসিনের ১ম ও ২য় অনুচ্ছেদে চিকিৎসকের মহৎ উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা হয়েছে। ৫ নম্বরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

  • আদর্শ আরোগ্য সাধন: রোগীকে দ্রুত, মৃদু এবং স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেওয়া চিকিৎসকের একমাত্র লক্ষ্য।
  • পক্ষপাতহীন পর্যবেক্ষণ: রোগলিপি (Case Taking) তৈরির সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে রোগীর প্রকৃত কষ্ট লিপিবদ্ধ করা।
  • রোগের কারণ অনুসন্ধান: রোগের উত্তেজক কারণ ও মূল মায়াজমেটিক কারণ খুঁজে বের করা।
  • ওষুধের জ্ঞান: বিভিন্ন ভেষজের বিশুদ্ধ ক্ষমতা ও প্রুভিং লক্ষণ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা।
  • পথ্য ও নিয়মানুবর্তিতা: রোগীকে সঠিক পথ্য নির্বাচন করে দেওয়া এবং আরোগ্যের অন্তরায়সমূহ দূর করা।

১২. জীবনী শক্তি (Vital Force) সম্পর্কে যাহা জান লেখ।

মহাত্মা হ্যানিম্যান অর্গাননের ৯ম অনুচ্ছেদে জীবনী শক্তির চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন। জীবনী শক্তির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ:

  • আধ্যাত্মিক ও অদৃশ্য: জীবনী শক্তি একটি অদৃশ্য, আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিমান চালিকাশক্তি (Autocratic, Spiritual Dynamics)।
  • সংহতি বজায় রাখা: এটি সুস্থ অবস্থায় মানবদেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে এক অপূর্ব সামঞ্জস্যে সচল রাখে।
  • অনুভূতি ও ক্রিয়া: দেহের যাবতীয় অনুভূতি ও জীবনক্রিয়া এই শক্তির মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়।

এই শক্তির স্বাভাবিকতা সুস্থতা এবং এর বিশৃঙ্খলাই হলো রোগ। চিকিৎসকের মূল লক্ষ্য হলো সূক্ষ্ম মাত্রার ওষুধ দ্বারা এই শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করা।

১৩. হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি বলতে কী বোঝ?

সঠিক ও সূক্ষ্ম মাত্রার সদৃশ হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রয়োগের পর, রোগীর মূল রোগ-লক্ষণগুলোর সাময়িক ও সামান্য যে বৃদ্ধি দেখা যায়, তাকে হোমিওপ্যাথিক বৃদ্ধি (Homoeopathic Aggravation) বলে।

কেন এমন হয়? যেহেতু নির্বাচিত ওষুধটি রোগীর রোগের লক্ষণের সাথে হুবহু মিলে যায়, তাই এটি শরীরে প্রবেশ করে একটি শক্তিশালী কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি করে। এই কৃত্রিম রোগের তীব্রতার কারণে সাময়িকভাবে মূল রোগটি একটু বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়। এটি একটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ, যা নির্দেশ করে যে ওষুধটি সঠিক হয়েছে এবং রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করবে।

১৪. চিকিৎসকের একমাত্র ও মহৎ উদ্দেশ্য কী? আলোচনা কর।

অর্গানন অব মেডিসিনের প্রথম অনুচ্ছেদে (Aphorism 1) ডাঃ হ্যানিম্যান ঘোষণা করেছেন: "The physician's high and only mission is to restore the sick to health, to cure, as it is termed." অর্থাৎ, অসুস্থ মানুষকে স্বাস্থ্য ফিরিয়ে দেওয়া বা আরোগ্য করাই চিকিৎসকের একমাত্র ও মহৎ উদ্দেশ্য।

কোনো কাল্পনিক তত্ত্ব তৈরি করা, মনগড়া চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার কিংবা দুর্বোধ্য ভাষায় প্রেসক্রিপশন লিখে রোগীকে বিভ্রান্ত করা চিকিৎসকের কাজ নয়। চিকিৎসকের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হবে রোগীকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে তাকে স্বাভাবিক কর্মক্ষম জীবনে ফিরিয়ে আনা।

১৫. "জীবনী শক্তির বিশৃঙ্খলাই রোগ" ব্যাখ্যা কর।

অর্গাননের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রোগ কোনো বাহ্যিক জড় পদার্থ বা অঙ্গের স্থানীয় বিকৃতি নয়। যখন কোনো অদৃশ্য মায়াজমেটিক শত্রু শরীরে প্রবেশ করে, তখন তা সরাসরি আমাদের অদৃশ্য আধ্যাত্মিক জীবনী শক্তিকে আক্রমণ করে ও তার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে।

এই অভ্যন্তরীণ ছন্দের বা শক্তির বিশৃঙ্খলাই বাইরের শরীরে লক্ষণ হিসেবে ফুটে ওঠে। যেমন—জ্বর, ব্যথা, আলসার ইত্যাদি সবই অভ্যন্তরীণ শক্তির বিশৃঙ্খলার বাহ্যিক প্রকাশ মাত্র। অতএব, জীবনী শক্তির এই বিশৃঙ্খল অবস্থাই হলো মূল রোগ, এবং বাহ্যিক লক্ষণগুলো তার ফল।

১৬. অসাধ্য রোগের কারণ ও আরোগ্যের উপায় কী কী?

অসাধ্য রোগের কারণ:

  • দীর্ঘদিন ধরে ভুল বা কুচিকিৎসার (যেমন- অপ্রয়োজনীয় অ্যালোপ্যাথিক বা অবদমনকারী চিকিৎসা) ফলে ভাইটাল অর্গানসমূহ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে।
  • মায়াজমের গভীরতা অত্যন্ত বেশি হলে এবং রোগীর জীবনী শক্তি ওষুধ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে।
  • শরীরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের গঠনগত স্থায়ী পরিবর্তন (Structural change) ঘটলে।

আরোগ্যের বা উপশমের উপায়: সম্পূর্ণ আরোগ্য সম্ভব না হলেও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গভীর ক্রিয়াশীল অ্যান্টি-মায়াজমেটিক ওষুধ সূক্ষ্ম মাত্রায় প্রয়োগ করে রোগীর কষ্ট কমানো যায় এবং জীবনের আয়ু বাড়ানো যায়। একে উপশমমূলক চিকিৎসা বা Palliative Treatment বলা হয়।

১৭. উপশম পদ্ধতি (Palliative Method) সম্পর্কে লিখ।

উপশম পদ্ধতি বা প্যালিয়েটিভ মেথড (বিপরীত বা অ্যান্টিপ্যাথিক পদ্ধতি) হলো এমন এক চিকিৎসা যেখানে রোগীর কষ্টের বিপরীত লক্ষণযুক্ত ওষুধ দিয়ে সাময়িকভাবে কষ্ট দূর করা হয়। যেমন: কোষ্ঠকাঠিন্যে জোলাপ দেওয়া, তীব্র ব্যথায় মরফিন বা পেইনকিলার দেওয়া।

হোমিওপ্যাথিক দৃষ্টিভঙ্গি: অর্গানন অনুযায়ী এই পদ্ধতি অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে সাময়িক আরাম হলেও পরবর্তী সময়ে রোগটি আরও তীব্র ও জটিল রূপ ধারণ করে ফিরে আসে। তবে একেবারে শেষ মুহূর্তের অসাধ্য রোগে যেখানে আরোগ্য অসম্ভব, সেখানে রোগীকে মৃদু আরাম দেওয়ার জন্য সদৃশ উপশমকারী ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

১৮. সোরার (Psora) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা কর।

মহাত্মা হ্যানিম্যানের মতে, 'সোরা' হলো সমস্ত চিররোগের আদি মাতা ও মূল উৎস। সোরার প্রধান ৫টি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:

  • চুলকানি ও চর্মরোগ: শরীরে বিভিন্ন প্রকার চুলকানি, একজিমা, ও চর্মের শুষ্কতা সোরার প্রধান লক্ষণ।
  • মানসিক লক্ষণ: সোরা প্রধান রোগী অত্যন্ত চিন্তাশীল, উৎকণ্ঠিত, কাল্পনিক ভয়ে ভীত এবং অধৈর্য প্রকৃতির হয়।
  • কার্যগত ব্যাঘাত: এটি অঙ্গের গঠনগত পরিবর্তন না করে মূলত শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপে (Function) ব্যাঘাত ঘটায়।
  • সংবেদনশীলতা: সোরার রোগী আলো, শব্দ, গন্ধ এবং আবহাওয়া পরিবর্তনে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়।

১৯. ওষুধ বলিতে কী বোঝ? ওষুধের আরোগ্য ক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে?

ওষুধ (Drug/Remedy): যে সকল ভেষজ বা উপাদান সুস্থ মানবদেহে প্রয়োগ করলে তার অভ্যন্তরীণ শক্তির বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে কৃত্রিম রোগ-লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ওষুধ বলে। আর যখন এটি সদৃশ নীতিতে রোগীর আরোগ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে রিমেডি (Remedy) বলে।

আরোগ্য ক্ষমতা কিসের ওপর নির্ভর করে: ওষুধের আরোগ্য ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার 'লক্ষণ উৎপাদনকারী শক্তির' (Symptom-producing power) ওপর। অর্থাৎ, একটি ওষুধ সুস্থ শরীরে যে যে লক্ষণ তৈরি করতে পারে, ঠিক সেই লক্ষণযুক্ত প্রাকৃতিক রোগীকে সে আরোগ্য করার ক্ষমতা রাখে।

২০. অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ফলাফল আলোচনা কর।

অ্যালোপ্যাথিক বা বিষদৃশ চিকিৎসা পদ্ধতিতে সাধারণত রোগের বাহ্যিক প্রকাশ বা একটি নির্দিষ্ট অঙ্গকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা হয়। অর্গানন অব মেডিসিন অনুযায়ী এর ফলাফল নিম্নরূপ:

  • রোগের অবদমন (Suppression): বাহ্যিক মলম বা তীব্র রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগের ফলে চর্মরোগ বা সাময়িক রোগটি ভেতরে বসে যায় এবং হৃদপিণ্ড বা ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে স্থায়ী ক্ষতি করে।
  • জটিল রোগ সৃষ্টি: দীর্ঘদিন অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ সেবনের ফলে ওষুধের নিজস্ব বিষাক্ততায় শরীরে নতুন ও জটিল কৃত্রিম রোগ সৃষ্টি হয়।
  • জীবনী শক্তির দুর্বলতা: তীব্র রাসায়নিকের প্রভাবে রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা জীবনী শক্তি স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

২১. এন্টিপ্যাথি (Antipathy) ও আইসোপ্যাথি (Isopathy) কী?

সহজে বোঝার জন্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে এন্টিপ্যাথি ও আইসোপ্যাথির সংজ্ঞা ও মূল পার্থক্য উপস্থাপন করা হলো:

পদ্ধতি মূল নীতি ও সংজ্ঞা উদাহরণ
এন্টিপ্যাথি (Antipathy) বিপরীত নীতি। রোগীর লক্ষণের সম্পূর্ণ বিপরীত লক্ষণযুক্ত ওষুধ প্রয়োগের চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি সাময়িক উপশম দিলেও রোগকে অবদমিত করে। উষ্ণতায় ঠাণ্ডা প্রয়োগ করা, অনিদ্রায় ঘুমের ওষুধ দেওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্যে জোলাপ দেওয়া।
আইসোপ্যাথি (Isopathy) একই নীতি। যে রোগ বা জীবাণু দ্বারা রোগ সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সেই রোগ বা জীবাণুর উপাদান থেকেই ওষুধ তৈরি করে চিকিৎসা করা। জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসায় ক্ষিপ্ত কুকুরের লালা থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহার করা।

Post a Comment

Previous Post Next Post